সেতু

0
12

চুলের মুঠি ধরে পিঠে ধুড়ুম ধুড়ুম করে চার পাঁচটা কিল বসিয়ে দিল সুরুজ।হাতের সামনে ছিল আঁখের টুকরো। সেটাই ঐ মুহূর্তে লাঠির কাজ করল।

মার খেয়ে কুঁজো হয়ে থাকা পিঠটাতে আঁখের আরো পাঁচ সাতটা বাড়ি পড়ল।নার্গিস প্রথম দিকটায় ঝাড়া দিয়ে উঠে রুখে দাঁড়াতে চেয়েছিল কিন্তু সুরুজের পুরুষালী পৈশাচিক শক্তির সাথে শেষ পর্যন্ত পেরে উঠল না।

আট বছরের শাওন মা ‘কে অনেক চেষ্টা করেও মারের হাত থেকে বাঁচাতে পারল না।
একপ্রস্ত মার শেষের পর সুরুজ যখন সিগারেট ধরাতে দেশলাই হাতে নিয়েছে, কোনরকমে পিঠটাকে সোজা করে নার্গিস তখন শাপশাপান্ত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।হাতের সামনে যা পাওয়া গেলো সবটাই মেঝেতে ছুড়ে ফেলছে।
নার্গিসের জানা সবরকম গালি তখন ফুল ভলিউমে বাজছে।
আবার তেড়ে আসে সুরুজ। এইবার ছেলের ক্রিকেট ব্যাটটা নিয়ে এসছে।নার্গিসও সর্বশক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।হাতের কাছে থাকা কাপড় কাটার কাঁচিটা তার এই মুহূর্তের প্রতিরোধের হাতিয়ার।
ছোট্ট শাওন কতক্ষণ মায়ের পায়ে ধরে “মা রে ইট্টু চুপ থাক্! মা রে ইট্টু চুপ থাক!”

আবার চোখের পলকে ক্রুদ্ধ বাবার পায়ে পরে থাকে আর বলে,
“আর মারিস না রে,মাফ কইরা দে!আর মারিস না!আর মারিস না!আমার মা’য় মইরা যাইব!মাফ কইরা দে!”

মায়ের গলা শুনলে দৌড়ে মার পায়ে ধরে বলে,”চুপ থাক মা,ইট্টু চুপ থাক।তরে মাইরা ফালাইব!”

ঘরের ভাঙা কাঁচের জিনিসপত্র ঝাড়ু দিয়ে শাওনই পরিষ্কার করে।


মন থেকে শ্রদ্ধা ভক্তি ভালোবাসা সবই মুছে গেছে নার্গিসের।
মনে প্রতিশোধ স্পৃহা তীব্রতর হয়ে থাকে কয়েকটা দিন।
“মন চায় ইন্দুরের বিষ মিলিয়া খাওয়াই জানোয়ারের বাচ্চারে”
“ট্রাকের তলে ফেইস্যা মরতে পারে না ঐ হারামীর পুত”
“সারাজনম বিধবা থাকুম,গার্মেন্টসে কাম কইরা খামু তবু অর নাগালের থন আমারে মুক্তি দেও মাবুদ”

ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে বসে চুলে তেল দিতে দিতে নার্গিস বিড়বিড় করে।

“ওমা আব্বুরে একটা ফোন দেও,অহনোও আইলো না।একটা ফোন দেও না!
রাইত বারোটা বাজে।”

“চুপ থাকবি!
অরে ফোন দেওন লাগব না।মইরা যাওক।মইরা গেলে বাঁচি!”

“ফোন দেও,কত রাইত অইয়া গেলো।আমার ডর করতাছে।আব্বু আহে না ক্যান!মরনের কতা আর কবি না,আব্বু মরলে আব্বু কমু কারে!”

ছেলে বেদনার্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ফোনটায় সংযোগ দিয়ে ছেলের কানে ধরিয়ে দেয় নার্গিস।

ছেলেটা বাবার আশায় দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে থাকে।

৩.
অই মাগী,আমার পোলার স্কুলের বেতন কাইল দিয়া আইবি।
টেহা এইহানে থুইয়া গেলাম।
বাড়িভাড়া দিয়া দিছি,ডিশঅলারে কবি লাইন ঠিক কইরা বিল নিয়া যাইতে।
আর অরে লইয়া গিয়া যা খাইতে চায় খাওয়ায় আনবি।

“তোমার খাওন খামু না,তুমি খালি আমার মা’রে মারো।
স্কুলেও আর যামু না”

“না বাপ, স্কুল লইয়া কোন কতা কইয়ো না।স্কুলে না গেলে বড় হইবা কেমনে?”

ছেলেটাকে বুকের কাছে লেপ্টে নিয়ে কথা গুলো বলে সুরুজ আলী।

“স্কুলে যামু না।স্কুলে গেলে একলা পাইয়া তুমি আবার মায়েরে মারবা”

“না বাপ মায়েরে লইয়া স্কুলে যাও।আমি অহন ঘরথন যাইতাছি গা।
আহনের সময় মায়েরে লইয়া কিছু কিন্যা খাইয়ো,টেকা দিয়া গেছি”

ভারাক্রান্ত মনে ছেলে বাবার বুকে মুখ লুকায়।

নার্গিস চোখ মুছতে মুছতে লালশাক রান্না শেষ করে,তার অনেক তাড়া, ছেলেকে নিয়ে এখুনি স্কুলে যেতে হবে।

৪.
মাস শেষ।নতুন মাসের আট তারিখ চলে।
বাড়িওয়ালার খটখট।
“নার্গিস কখন ভাড়া দিবা তুমরা”
পানের পিক ফেলতে ফেলতে ঘরের ভিতরে উঁকি দেয় বাড়িওয়ালা।
“হেয় আহুক,কমু নে”

“দুই আনার মুরোদ নাই, সুরুজ্যা আবার দেহি পোলারে ইংলিশ স্কুলে পড়ায়!”

“দুই আনার মুরোদ নাই আপনারে কে কইল?
দু একমাসের ভাড়া আটকায় রাখছি?”
মুখ ঝামটা দিয়ে বাড়িওয়ালাকে কথাগুলো শুনিয়ে দিলো নার্গিস।

“জামাই বৌয়ের তেজ দেখলে মুনে হয় তুমরাই বাড়িওয়ালা।
সামনের মাসে থাইকা পাঁচ তারিখে ভাড়া দিতে না পারলে ঘর ছাইড়া দিবা”

খুন্তি দিয়ে ঠাস করে একটা বারি মেরে মাটির ব্যাংকটা ভেঙে ফেলে নার্গিস।
গুনে গুনে নয় হাজার তিনশ সাতাশ টাকা পায়।
তিনবছর ধরে মাটির ব্যাংকটা জমাচ্ছিলো এক জোড়া ঝুমকা দুল বানানোর আশায়।

“অই খাড়ান!
ভাড়া নিয়া যান।”
তাচ্ছিল্যের হাসি টেনে বাড়িওয়ালার পান খাওয়া মুখের সামনে আট হাজার টাকা তুলে ধরে নার্গিস।

“অহন টেকা কই পাইলা নার্গিস!”

“আর কুনো দিন সুরুজেরে লইয়া কিছু কইতে লইলে দশবার ভাইবেন।হের মুরোদ আছে।অক্ষম না।হের বৌয়ের কাছেও টেকা থাহে”

অপমানে বিস্ময়ে বাড়িওয়ালার পানখাওয়া মুখটা ঝুলে থাকে।

যোহরের আজান হয়েছে।টিভি বন্ধ করে ওযু করতে যায় নার্গিস।
নামাজ পড়তে হবে।খুব করে দোয়া চাইতে হবে।”শাওনের বাপের যেন অনেক টেকা হয়”

Writer: Muskan Youhana

বাবা

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here