রূপা

আমি যখন সেবার এক কাপড়ে নাহিনের সাথে বেরিয়ে এলাম,আমার মধ্যে রক্ত গরম করা তেজ ছিলো,পালানোর ঠিক আগ মুহূর্তে আমার একটাবারের জন্যেও মনে হয়নি,আমি যে বেরিয়ে যাচ্ছি,আমার মা,

আমার বোন, আমার ভাই, বাবা- এরা লোকের কাছে মুখ দেখাবে কেমন করে?এ যাবতকাল যে আমার মা বাবা, নানা নানী,দাদা দাদী,চাচা চাচী,মামা খালা সবাই আমাকে নিয়ে বড্ড গর্ব করে বলতো,”আমাদের বাড়ির বড় মেয়ে!মুখ রাখবে আমাদের!পড়ালেখা করছে,রাজপুত্রের মত ছেলে দেখে বিয়ে দিবো”।

অথচ পালানোর আগে,অর্থাৎ পালাবো যে এই সিদ্ধান্ত নেবার আগে যতবার আমরা গল্প করতাম,বাড়ির লোকজনের বাধা বিপত্তি নিয়ে কথা বলতাম,ওকে আমি বারবার বলতাম,আচ্ছা নাহিন,আমরা যদি পালিয়ে যাই,লোকে তো থু দেবে!আমার ছোট বোনটার ভবিষ্যত? আমার পরিবারের লোকজনের বুক ফোলানো সেই গর্ব? মাটিতে মিশিয়ে দিবো আমি নিজের স্বার্থের জন্য?

কি অদ্ভুত এত এত সৎ আর ত্যাগী কথাবার্তার ঝাঁজ সেদিন কাজেই দিলোনা।
কলেজ লাইফ থেকেই নাহিনের সাথে আমার সম্পর্ক,মানুষ যখন আমাদের জিজ্ঞেস করতো,তোদের সম্পর্ক কতদিনের রে? আমি সবসময় বলতাম,কোন সম্পর্ক? বন্ধুত্ব? নাকি তার চেয়েও বেশি যেটা সেটার বয়স জানতে চাস?


লোকে হাসতো।সবসময় আমার উত্তর এমন হতো,আমাদের সম্পর্ক এত দিনের,আর বন্ধুত্ব তার চেয়ে ঠিক ১১ মাসের বেশি।
কলেজ লাইফের শুরুতেই বন্ধুত্ব টা হয়,আমাদের মাঝে ঘটে যাওয়া সব কিছুই আচমকা ছিলো,বন্ধুত্ব,প্রণয় সবই!

প্রথম যেদিন ওকে দেখি,আমার মনে হচ্ছিলো,এত শ্বেত ধবলী খরগোশ টা এখানে কি করে?
তার সাথে যখন কথা শুরু হলো,আমাকে বলেছিলো,জানো রূপা,তোমাকে শাড়িতে অসম্ভব সুন্দর লাগছিলো!
– (আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই!) নাহিন…আমাকে শাড়িতে কবে দেখেছো তুমি?
– কি বলো,প্রথম্ন দেখাই তো হলো সেদিন।সেদিনই তো দেখা হলো!সে কি চঞ্চলতা তোমার মাঝে,নজরকাড়া হাসি,ছোট বাচ্চাদের মত উল্লাস!

– ( বুঝলাম,কামিজের ওড়না টা এক সাইডে বাকা করে নেয়াতে,সে ভেবেছে আমি শাড়ি পড়েছি,তাকে আর লজ্জায় ফেললাম না সেদিন,ভাবলাম দেখা হলে পরবর্তীতে বলে দেবো) ওহ হ্যা! ধন্যবাদ!
বন্ধুত্ব টা শুরু হয় এভাবেই,কিভাবে কিভাবে যেন বছর ঘুরতেই বন্ধুত্ব টা প্রেমে পরিণত হয়ে গেলো।

লোকে বলে,পাগল প্রেমিকের চেয়ে সৎ বন্ধু উত্তম। সম্ভবত সেইরকমই কিছু ঘটেছে আমাদের সাথে।
অথচ এই নাহিন আর আমিই একজন আরেকজনকে ক্রাশ ভালোবাসা ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে গল্প করতাম!

তবে হ্যা,বুকে হাত রেখে আমি বলতে পারবো,এই বন্ধুত্ব টাকে আমি কখনোই প্রণয় ভালোবাসায় রূপ দেয়ার অভিলাষ নিয়ে এগোইনি।বছরের শেষ দিক টায় যখন আমি নানা ঝট ঝামেলায় মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ি,তখন এই ছেলেটাই ছায়ার মত আমার পিছে লেগে ছিলো।না,আমি শতভাগ নিশ্চিত হয়ে বলবো,

ওর মধ্যে আমার মনে জায়গা করে নেয়ার কোনো উদ্দেশ্য ছিলোনা,কিংবা আমার কাছাকাছি আসার ও কোনো প্রবণতা দেখিনি আমি কখনো,বন্ধু হিসেবে সে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বন্ধু হিসেবেই থেকেছে সব সময়!শেষ দিকটায় কেন যেন ও আমার পাশে বসলে মনে হতো,আগের অনুভূতি না এটা,একটু আলাদা।

কিছুটা ভিন্নরকমের টান কাজ করে ছেলেটার প্রতি,সে কথায় কথায় দুষ্টুমি করে কারণে অকারণে আমাকে বহুবার বলেছে,রূপা আমি না তোকে অনেক ভালোবাসি!অনেক!

– ভালোবাসিস?
– হ্যা! খুব বেশি!
– হ্যা রে,আমিও যে বাসি!
– চল বিয়ে করি!
– ওরে আমার পুরুষরে!যেই না তার বুকের পাঠা,চল বিয়ে করি! যা ভাগ!

বুঝতাম,ছেলেটা আমাকে হাসাতেই ভালোবাসে।
হ্যা ও যেভাবে আমার বিপদে আমার পাশে থেকেছে,সেই থেকে ওর প্রতি বন্ধুত্বের ভালোবাসা ছাড়াও প্রগাঢ় এক অনুভূতি জন্মাতে শুরু করে,আমি বুঝতাম কিছুটা, শুদ্ধতম ভালোবাসার ছোয়া বোধহয় আমি ওর কাছেই পাবো।

কিন্তু হ্যা,যখন থেকেই এই ভিন্ন অনুভূতি টা কাজ করা শুরু করে,আমি নিজেকে সংযত রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি,কোনো ভাবেই যেন ও বুঝতে না পারে আমার অনুভূতিগুলোর কথা।ভাবতাম, এই নিছক অনুভূতির জন্য নিজের প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে হারাবো?

নিজেকে অনুভূতির ছোয়া থেকে দূরে রাখতে যত যা করা দরকার করেছি,পেরেও গিয়েছিলাম,যদি না পহেলা ফাল্গুনের দিন সে আমার হাত ধরে না বলতো,”রূপা তুই কি অনুভূতিহীন? নাকি আমার চোখের ভাষা বুঝেও এভাবে নিজেকে দূরে রাখছিস?”

লোকে বলে,ছেলে মানুষ সহজে কাঁদে না!কিন্তু সেদিন ওর চোখের কোণে চিকচিক করতে থাকা পানির বিন্দুকণা দেখেছিলাম আমি।
আমি সেদিন ওকে ফিরাতে পারিনি,ওর হাতের উপর যখন হাত রেখে হাসি দিলাম,ও বুঝেই নিয়েছিলো,এই রূপাও যে ভালোবেসে আড়ালে চোখের জল ফেলে।

সেদিন ও কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলো,দেখিস,তোকে আমি কোনোদিন কষ্ট দিবোনা,যদি নিজের অজান্তে দিয়ে ফেলি,যা ভালো লাগে শাস্তি দিস।
…শুরু হয় আমাদের নতুন করে পথ চলা।আমি আমাদের সম্পর্কের প্রথম ৬/৭ মাসের কথা কখনো বলতে চাইনা,আজও চাইনা।

আমি বলবো ওটা ছিলো আমার জন্যে এক ধরনের পরীক্ষা। জানিনা কি এক অদ্ভুত জোর পেয়েছিলাম,হাজার বাধা বিপত্তি আসুক,পণ করেছিলাম,ওর হাত আমি ছাড়বোনা কখনোই!
আমাদের আলাদা করার চেষ্টা করেনি,এমন মানুষ তখন খুব কমই ছিলো।

ওর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা ছিলো,দুধ দিয়ে কালসাপ পোষা!
চলার পথে হরেক রকমের মানুষ আসে জীবনে,ওর সাথেও তাই হয়েছে।পাতানো বড় বোন – এই এক টা ব্যাপার ছিলো আমার সম্পর্কের দুর্দিনের অন্যতম কারণ।এদের কথা শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলাম আমি।সত্যি বলতে কি, সম্পর্কে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ বরাবরই অশান্তির সৃষ্টি করে।

আর আমাদের ব্যাপারেও তাই হয়েছিলো,আমাদের সম্পর্কে যদি “প্রাইভেসি” নামক কিছু থাকে,তাতে এই “পাতানো বড়” বোন দের হিসেবের বাইরে রাখতে হতো,অর্থাৎ আমাদের সম্পর্কের প্রতিটা ব্যাপারে এদের মাথা ঘামাতে হতো।

অবাক হতাম,নাহিনও কখনো প্রতিবাদ করতোনা,বলতো,ননদের মতই তো,তোমার তো আপন ননদ নেই,একটু নাহয় মজা করে,সহ্য করে নিতে পারবানা?

খুব সাবলীল ভাবে বলতো কথাগুলো,মেনেও নিতাম।এহেন কোনো অন্যায় বা বিবেকহীনতা নেই যা এই পাতানো বোন গুলো করেনি।এত কিছুর মধ্যেও টিকিয়ে রাখতে পেরেছিলাম সম্পর্কটা, কেননা,নাহিন হাজার হোক,আমায় ভালোবাসতো,খুব বেশি ভালোবাসতো।

নিজের ভুল যখন বুঝতে পারতো,অসহায়ের মত আকুতি করতো,নিজেও বুঝতাম,কাছের মানুষ যখন কানপড়া দেয়,তখন আসলে নিজের বিশ্বাস এর উপর দৃঢ় থাকা মুশকিল।
হঠাৎ কি হলো জানিনা,নাহিন বদলে যেতে লাগলো।সেদিন একবার ওর এই পাতানো বোনেরা আমাকে ফোন করে আরো যাতা কথা শুনায়,সেদিন নাহিনকে কিছুই বলিনি,কারণ জানি,বলেও লাভ নেই।

শুধু এটুকই বলেছিলাম,ওরা ফোন করেছিলো,পড়ছিলাম,জানত­ে তো তুমি?ওদের মানা করা যেতোনা? ভাইয়া বিরক্ত হয়।
ও শুধু বলেছিলো,একটু অপেক্ষা করো,আসছি।খুব আশাহত হয়েছিলাম,এতটুকু প্রতিক্রিয়া দিলোনা?
কিন্তু পরে দেখলাম,ও সেই পাতানো বোনেদের ইচ্ছেমত কথা শুনিয়েছিলো সেদিন।

জানিনা ঠিক খুশি হয়েছিলাম কিনা,কিন্তু বহুদিন পর মনে হয়েছিলো,আমকি সেই আগের নাহিনকে ফেরত পেয়েছি,যে আমার ছোট্ট থেকে ছোট্ট খারাপ লাগা গুলোর ও পরোয়া করে ।
সেদিনের পর থেকে নাহিন আর আগের মত নেই,না সে অনেক বদলে গিয়েছে,অনেক,যা আমার কল্পনাতীত।
সব ছেড়ে সেও আমার সাথে হাতে হাত লাগায়,সম্পর্কটাকে মজবুত করতে সেও উঠে পড়ে লাগে।

দিন টা ঠিক মনে নেই,ছুটির দিন ছিলো,এক বিকেলে পার্কের বেঞ্চিতে বসে আছি,আমার হাতের উপর হাত রাখে,হঠাৎই আমার হাত ওর গালে টেনে নিয়ে এলোপাথাড়ি মারতে থাকে আর অবুঝের মত কাঁদতে কাঁদতে বলে,রূপা,সম্পর্কের মানে আমি এতদিন বুঝিনি!নিজেকে এত টা গুঁটিয়ে রেখেছো কেন তুমি?

তোমাকে এমন চুপচাপ দেখলে আমার ভালোলাগেনা,বিশ্বাস করো,একটুও ভালো লাগেনা!আমার সেই চঞ্চল রূপাকে কবে ফিরে পাবো?এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে যায় ও,চোখে পানি টলমল করছে দুজনেরই।

সত্যি বলতে কি,আমি হাফিয়ে উঠেছিলাম,পারছিলাম না একা একা সম্পর্ক্টাকে টেনে নিতে,তবু হাল ছাড়িনি।
সেদিন কিচ্ছু বলিনি ওকে,জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে ছিলাম অনেকক্ষণ,আশেপাশের লোকজন কি ভেবেছে কি বলেছে আমি জানিনা,আমার মাথায় কিছুই ছিলোনা।শুধু মনের মানুষকে ফিরে পাবার যে আনন্দ আর কান্না সেটাই টের পাচ্ছিলাম।

 

…সে কি!কোথায় ছিলাম যেন! ওহ হ্যা,সম্পর্কের খাতিরে আমাকে আর কখনো পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি,এই মানুষটা আমাকে যেভাবে আগলে রেখেছে, আমি বলবো আমি দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি।

মানুষ যখন রানভীর সিয়ামের উদাহরণ দেয়,আমার চোখে তখন নাহিনের ওই শ্বেতশুভ্র চেহারা টা ভাসে।আমরা যখন কোনো ভীড় আছে এমন জায়গা গুলোতে যাই,সে পেছন থেকে আমার দুই বাহু শক্ত করে ধরে রাখে,আমাকে সামনে রেখে আশেপাশে মানুষ থাকলে সরিয়ে কিভাবে যেন বের করে নিয়ে আসে,আমার যখন জ্বর কাশি ঠান্ডায় নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়,তখন এই পাগলটা সারারাত কলে থাকে,আমি ঘুমিয়ে গেলেও সে আমার নিশ্বাসের শব্দ শুনে,সারা টা রাত, ভোর হওয়া অব্দি এভাবে জেগে থাকতো সে।

আমি খেতে না চাইলে ছলে বলে কৌশলে কিভাবে যেন খাবার গুলো আমাকে খাইয়ে দিতো,ছেলেটা জাদু জানে!
রাগ করলে ছোট্ট বাচ্চাদের মতন মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো,কপালে যখন আলতো করে চুমু দেয়,সেটা একদম জাদুর মতন কাজ করে!

কলেজ শেষ,ভার্সিটি লাইফের মাঝামাঝিতে এসে, আমার বাড়ির লোকজন বিয়ের জন্যে জোড়াজুড়ি করতে থাকে,নাহিনের কথা এক পর্যায়ে বলে দেই,ভেবেছিলাম ওর কথা জানানোর পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হবে।
কিন্তু না,বিয়ের প্রেশার দেয়া বেড়ে যায়,আমার সেলফোন নিয়ে যায়।নাহিনের সাথে সপ্তাহে দুই একবার যোগাযোগ করার সুযোগ পেতাম তাও সবসময় না।

আমার ভার্সিটি যাওয়া আসাও বন্ধ করে দেয়,শুধু পরীক্ষা দিতে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলো।।এরই মধ্যে আর পরীক্ষা এসে যায়,এই সময়টায় নাহিন প্রায়ই নাসার আশেপাশে থাকতো,একটু যদি দেখা পেতো।
কিন্তু তাতে আমার উপর প্রেশার টা বেশি আসতো,তাই ও আর আসতোনা।

পরীক্ষা দিতে যেদিন যাই,ওর হাত ধরে বলেছিলাম,হাত জোর করি,চলো পালিয়ে যাই!আর পারছিনা!
ও কিছু বলেনি,সেমিস্টার শেষ হবার অপেক্ষায় ছিলাম দুজনই।ও খুব সুন্দর করে বুঝাতো আমাকে,একটা কিছু ব্যবস্থা করি,৮/১০ হাজারের টিউশনিতে থাকা যাবে? খুব কষ্ট হয়ে যাবেনা? বেশি না,হাতে আর কিছু টাকা জমুক? তোমায় নিয়ে আসবো আমি।

অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম।
হঠাৎ একদিন,মা এসে বলে,রূপা,শাড়িটা পড়ে নে।দেখতে আসবে তোকে।
সেদিন মায়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম শুধু,ভেবেছিলাম মা অন্তত আমার অবস্থাটা বুঝবে,মায়ের চোখে সেদিন আমি সবচেয়ে কঠিন দৃষ্টি দেখি।

শাড়ি পড়ে,বসে ছিলাম,মা এসে খোপা করে দিলো,হাতে চুড়ি,গলায় একটা ছোট হাড়,আর কপালে টিপ দিয়ে দিলো।
আমি কাঠের পুতুলের মতন বসে ছিলাম,শেষ সুযোগটাও কি পাবোনা আমি? নাহিনের বুকে আর একবার মুখ গুজে দিতে পারবোনা?

সেদিন ওরা আংটি পড়াতে চেয়েছিলো,জানিনা কি এক অদম্য সাহস জুগিয়েছিলাম,উখের উপর বলেছিলাম,আংটি পড়াতে চান,ছেলের বউ করে নিতে চান,মেয়ের মতামত জানতে চেয়েছেন?
ছেলে,ছেলের মা,বাবা অবাক দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকায়।পাশ থেকে ভাই ধমকে উঠে,কি ধরনের বেয়াদবি রূপা এটা?

কারো কথায় পাত্তা না দিয়ে বলেছিলাম,খোজখবর না নিয়েই যে এত দূর আসছেন,ভেবেছেন? বিয়ের পর যদি ছেলের বউ পুরনো প্রেমিকের কাছে উড়াল দেয়?
নাকি মেয়ের মতামতের গুরুত্বই নেই আপনাদের কাছে?
আমার হাত সেদিন ওরা আংটি পড়াতে পারেনি।

ওরা যাবার পর বাবা আর ভাই দুজনের শক্ত হাতে দু’খানা চড় খেয়েছিলাম,জীবনে ওই প্রথম বাবা গায়ে হাত তোলে,ভাই নাহয় কারণে অকারণে মেরেছে,কিন্তু বাবা ওই প্রথম।
মা বলেছিলো,পোড়ামুখি!এত দম্ভব কেন?এরকম জারজ কে পেটে ধরেছিলাম ?! মরতে পারিস না?
এক মুহূর্তের জন্য ভেবেছিলাম,শেষ করে দেই নিজেকে।কিন্তু ওই খরগোশটার কথা মনে পড়তেই বেঁচে থাকার জোড় খুজে পাই।

কিছু না ভেবেই সেদিন বেরিয়ে পড়ি এক কাপড়েই,হাতে জমানো বেশ কিছু টাকা ছিলো,তাই নিয়ে বের হই।
ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে নাহিনকে ফোন দেই।ও শুধু জিজ্ঞেস করলো,”তুমি কোথায়?থাকো ওখানেই আসছি আমি।”

ও ৩০ মিনিটের মাথায় লোডের দোকানের সামনে এসে যায়।সেদিন ওই অন্ধকারেই দুজ্জন হাত ধরে বেরিয়ে পড়ি। ১০ হাজার মাসে ইনকাম করতো ও,আমিও ২/৩ টা টিউশনি করতাম, সব মিলিয়ে দুজনে ৩০হাজার ইনকাম করতাম।
চিলেকোঠা ভাড়া নেই।স্বপ্নের ঘর!
আগে,রাত বিরাতে ভালোবাসার কথামালা ছুড়াছুড়ি করতাম দুজনে,চিলেকোঠায় থাকবো,ভালোবাসার কমতি হবে না!
হয় ও নি।

মাঝে মাঝেই কাজ থেকে ফিরে এসে হঠাৎই বলতো,চলো,ঝাল ফুচকা খেতে যাই!চলো চাঁদের আলোয় ভিজি দুজনে!
সময়ে অসময়ে, চলো হাঁটতে যাই!
…তিন বছরে কেটে যায়,এরই মধ্যে নাহিন আমি পড়াশুনাও শেষ করি,ও ছোটখাটো একটা চাকরী পায়,আমিও শুরু করি।সংসার কেটে যায়।

এসব একাকীত্বের মাঝে ও প্রায়ই বলতো,”রূপা, পরিবারে নতুন সদস্য এলে কেমন হয়?” শুধু বলতাম , “অবস্থা আরেকটু ভালো হোক,যে আসবে তাকে আমি অভাব বুঝতে দিতে চাইনা,কোনো কিছুর কমতিতে রাখবোনা”
ও তাই মেনে নিতো,কখনো জোড়াজুড়ি করতোনা।

এত ভালোবাসার মধ্যেও মাঝেমধ্যে এক বিরাট শূন্যতা আমাকে গ্রাসস করতে থাকে।নাহিনের মা,অর্থাৎ আমার শাশুড়ি নারাজ ছিলেন।তার ধারণা যে মেয়ে পরিবার ছেড়ে একা বের হয়ে আসতে পারে,সে আমার ছেলেও ছেড়ে যেতে পারে।সুতরাং তিনি নারাজ।

আমারও আর কুলায়নি গায়ে গতরে,এদের যে মান ভাঙাবো।তবে হ্যা,৩ বছরে যে আমার শাশুড়ি আম্মা একেবারে আমাদের খোঁজ নেননি তা না,ফোন দিতো,বাসায় আসতো,কিন্তু কখনো আমাদের যেতে বলতোনা।
তবু খুব ইচ্ছে করতো,এক মাকে তো হারিয়েছি,এই মাকে আপন ভেবে একবার জড়িয়ে ধরলে কি আমায় ফিরিয়ে দিবে?

নাহিন কখনো আমাকে এসব নিয়ে প্রেশার দেয়নি,ও ওর অবস্থান থেকে যথাসাধ্য চেষ্টা করে গেছে।
অবাক করা বিষয়,আমার পরিবার,অর্থাৎ আমার মা বাবা ভাই বোন কখনো আমার সাথে যোগাযোগ করেনি,ফোন দিলে ফোন কেটে দিতো।একাধিকবার দিলে সুইচ অফ করে দিতো।
শেষ বছরে আর দেইনি।

বিয়ের ৩ বছর শেষ হতে চললো।নাহিনের ভালোবাসা প্রতিনিয়ত আমাকে নতুন করে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়।
ও অফিসে যায় রোজ ৮ টায়,ফিরে সন্ধ্যা ৭টায়
হঠাৎ একদিন কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগা শুরু হয়,মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাই বিছানার পাশেই।নিচ তলার বাসার রূম্পা কি ভেবে যেন ডাকতে আসে,সচরাচর আসেনা ও।
হয়তো উপর ওয়ালাই সেদিন ওকে পাঠিয়েছিলেন!

ও কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে জানালা দিয়ে উকি দেয়,চিৎকার করে ওঠে আমাকে নিচে পড়ে থাকতে দেখে।
দরজা ভেঙে ঢুকে কয়েকজন লোক নিয়ে ঢুকে।
ধরাধরি করে বিছানায় উঠায়,নাহিনকে কল দেয়।
দৌরে বাসায় আসে,ডাক্তার আসে।

বেশ তো, ডাক্তার সরাসরি বলেন,মিষ্টি আনেন নাহিন সাহেব!ওর বুঝতে বাকি রইলোনা।
সব্বাইকে সেদিন ও মিষ্টি খাওয়ায়,সেদিন ও ৩ কেজি মিষ্টি নিয়ে আমার বাবা মায়ের কাছে যায়,অবাক করে দেয় ওকে তারা।

“আমাদের মেয়ে মরে গেছে,যার বিয়েই মেনে নেইনি,তার সন্তানের আগমনে আর কি খুশি হবো”- বাবা কঠোর মুখে বলে দেয়।ও অবশ্য এসব আমাকে তখন বলেনি,সেদিন ছোটকি আমায় ফোন করে কেঁদেছিলো!৩ বছর পর আমার বোনটার গলা শুনলাম।ও আমাকে সব বলে,নাহিন চলে আসার পর বাবা কেঁদে দেয়!
সে খুশিতে আত্মহারা ছিলো,কিন্তু অসম্ভব জেদ আর আত্মসম্মানের কাছে সেদিন তার ভালোবাসা চাপা পড়ে যায়।

সেদিন আমার মা,মানে নাহিনের আম্মু,দেশী মুরগীর ঝোল,শৈল মাছের ঝোল,তেঁতুলের আচার,আরো নান্ন রকমের জিনিস নিয়ে আসে।
সেদিন মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেই,না আমাকে ফিরিয়ে দেন নি তিনি।
মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলেছিলেন,কে বলেছে তোর কেউ নেই? আমার রাগ আর ব্যবহারে খুব পেয়েছিস না রে মা?এই যে কথা দিলাম,তোকে মায়ের অভাব বুঝতে দিবোনা!

মাকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে ছিলাম,নাহিন আমাদের এভাবে দেখে কি করবে বুঝতে পারছিলোনা,দুজনের কপালে চুমু দিয়ে জড়িয়ে ধরে।
মা একবার ফ্যন করেছিলো,কিন্তু তিনি তার স্বামী অর্থাৎ আমার বাবার দেয়া সীমারেখা অতিক্রম করেনি।ভদ্রতার খাতিরে এবেলা ওবেলার খোজ নিয়ে কল রেখে দেয়।আমার কোনো আক্ষেপ ছিলোনা সেদিন।

আমার ভেতরটায় যে সত্ত্বা বড় হতে থাকে,তাকে নিয়ে আমার মা’র এবং নাহিনের জল্পনা কল্পনার শেষ ছিলোনা।
মা আমাদের নিয়ে প্রথম মাসেই নিজের বাড়িতে উঠেন।
আমার যত্নের কোনো কমতি রাখেন নি,প্রতি রাতে আমার হাতে পায়ে তেল মালিশ করে দিতেন,মাথায় তেল লাগিয়ে দিতেন।

নাহিন সময় না পেলে মা ই আমাকে চেকাপে নিয়ে যেতো,মাঝেমধ্যে ছোটকি আর বড় ভাই আসতো দেখতে,কিন্তু মা কিংবা বাবা কোনোদিন আসেননি।
৮ মাস ২৫ দিনের মাথায় প্রচন্ড ব্যথা উঠে,নাহিন সেদিন বাসায়ইই ছিলো,অবস্থা বেগতিক দেখে এম্বুলেন্স ডাকে।

মা আর নাহিনের চোখে আমি সেদিন প্রিয়জন হারানোর তীব্র ভয় দেখেছিলাম,মা আমার মাথায় হাত বুলাতে থাকে,দুয়া দরুদ পড়তে থাকে,নাহিন হাত শক্ত করে ধরে রাখে।

OT তে ঢুকার আগে নাহিন আর মায়ের পাশে আমি বাবা র মাকেও দেখি!চোখ বন্ধ হয়ে যায় আমার!
জানিনা কতক্ষণ, ওই যন্ত্রণায় বারবার জ্ঞান হারাই আমি।

সব শেষে ডক্টর এসে মাস্ক খুলে মুচকি হাসে,একি!এ যে আমার ছোট বেলার খেলার সাথী নীরা!
নার্স এসে তোয়ালেতে জড়ানো একটা ছোট্ট পুতুলকে নাহিনের কোলে দেয়,ও আমার কাছে নিয়ে আসে,বেশ না? হুবহু দেখতে নাহিনের মত হয়েছে!না না!ঠিক নাহিন না,কিছুটা ওর দাদীর ছোয়া লেগেছে!
হঠাৎ বাবা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে,”আমার নাত্নিকে কোলে দেও!দেও ওকে!”

সেদিন বাবা মা আমার হাত ধরে ঘন্টাখানেকের উপর কেঁদেছিলেন,বাবার কঠিন আত্মসম্মানবোধ সেদিন মোমের মত গলে গিয়েছিলো!
তবুও তো জোড়া লাগলো?আমার ভালোবাসা জিতে গেলো তো!
© Tabassum Sruty

মনের বসন্ত 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here