মনের বসন্ত 

1
22

– তুমি রিশাদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট কেনো একসেপ্ট করলে?

– তুমি তো ভালো করেই জানো – রিশাদ আমার ভালো বন্ধু ছিলো – হয়তো ভুল করে সেদিন প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে ফেলেছিলো – তারপর থেকে তো আজ সাত বছর কোনো যোগাযোগ নাই!

– কিন্তু এখন নতুন করে যোগাযোগের মানে কি?

– সোহান তুমি কি বলতে চাচ্ছো?

– ভুল করে কেউ প্রেমের প্রস্তাব দেয় ; বাহ! দারুণ যুক্তি! আর ভালো করে শোন – প্রেমের প্রস্তাব দেয়া ছেলে সাত বছর কেন – ষাট বছর পরেও বুকের গহীনে সেই প্রেম নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।

– এইরকম আজব কথাবার্তা বলছো কেন? বিয়ের পর থেকে তোমার জ্ঞানের পরিধি এরকম শূন্যের কোটায় নেমে আসবে জানলে আমি জীবনেও তোমাকে বিয়ে কররাম না!

– তবে কি সেই রিশাদকে বিয়ে করতে?

বিছানা থেকে একটা বালিশ নিয়ে সোহানের দিকে ছুঁড়ে মেরে জয়ী বলে – তুই বের হয়ে যা ; আমার রুম থেকে এক্ষুনি বের হয়ে যা – তোর মতো নিচু মনের মানুষের সাথে কেমনে আমি পাঁচ বছর প্রেম করলাম! তুই একটা আস্ত ছোটলোক।

– এখন তো বলবাই – তোমার রিশাদ ব্যাক করেছে এখন তোমার লাইফে!

এইবার খাটের সাইড টেবিলে রাখা ফুলদানিটা হাতে তুলে নেয় জয়ী।

নিজের জান বাঁচাতে এক দৌড়ে রুম থেকে বের হয় সোহান। এই মেয়ে রাগলে হুশ থাকে না ; কোনো অঘটন ঘটাইয়া ফেলতে পারে। সেই ভয়ে রাতটা সোহানের পাশের রুমেই কেটে যায় ; সকালে অফিসে যাবার বেলায় টেবিলে কোনও নাস্তা পায় না।

বুয়া এসে বলে – খালুজান – খালা কইসে আজকে আবার আপনার খাওন বন্ধ।

– তোমার খালা নাস্তা করে অফিসে গিয়েছে?

– না খালুজান – আপনের লগে লগে খালাও খাওন বন্ধ কইরা দিছে ; আমার কথা তো খালুজান আপনারা শুনেন না – বিয়া হইলো তিন বছর – এইবার একটা ছাওয়াল পয়দা করেন দেখবেন কয়দিন পর পর আর এই ঝগড়া ঝাটি হইবো না।

– খালা তোমার ভাষণ শেষ হইসে! এখন চলো বের হই ; আমি দরজায় তালা দিমু।

জ্বি আইচ্ছা খালুজান – আমার মেসের দেরী হইয়া যাইতাছে – আমি যাই।

সোহান তার বাসার পাশের ছোট্ট খাবারের দোকানে নাস্তা করার উদ্দেশ্যে ঢুকতেই মধ্যবয়স্ক ক্যাশিয়ার আবুল মিয়া বলে – আরে মামা – আবার বুঝি ঝগড়া হইসে?

– মামা – পরোটা আর ভাজি দিতে বলেন তো – সোহান প্রসঙ্গ পাল্টাতে চায়।

– পরোটা আর ভাজি’র অর্ডার দিয়ে আবুল মিয়া বলে – বুঝলেন মামা – ঝগড়া হইলো সংসার জীবনের মজার অংশ ; ঝগড়া না হইলে পানসে হইয়া যাইতো সংসারটা।

ছোট মুখে বড় কথা বলি – ঘরে পোলাপাইন আসলে দেখবেন এইসব ঝগড়া ঝাটি অনেক কইমা যাইবো। আচ্ছা – আপনে যাইয়া – অই টেবিলটাতে বসেন – খাবার পাঠাইয়া দিতাছি।

জয়ী’র সাথে প্রতি সপ্তাহে কম করে হলেও দুই দিন ঝগড়া হয় আর সেই সুবাদে আবুল মামা’র খাবারের হোটেলে সোহানকে খেতে হয় ;আর সাথে আবুল মামা’র ফ্রি উপদেশ হজম করতে হয়।

নাস্তা সেরে রিকশায় চড়ে অফিসে যায় সোহান – কাজের ফাঁকে কলিগদের সাথে হাসি – ঠাট্টা’র জন্য সবাই সোহানকে খুব পছন্দ করে ; আজ একেবারেই চুপ ; অফিসের এক কলিগ – আফরান ইসলাম এসে সোহানের সামনের চেয়ারটা টেনে নিয়ে বলে – কী সোহান ভাই – মুড অফ! আবার ক্যাঁচাল হইসে নাকি ভাবীর সাথে!

– সংসার মানেই তো ক্যাঁচাল! বলে সোহান।

– একদম ঠিক – মাঝে মাঝে মনে হয় বিয়া করাটাই একটা বড় ভুল ; তবে ভাই বাচ্চার মুখটা যখন দেখি তখন যে কী ভালো লাগে – শান্তিটা বুঝলেন ওই জায়গায়। আপনারে তো কতবার করে বললাম – বাচ্চা নিয়া নেন – দেখবেন কি শান্তি আর শান্তি।

সোহান চুপ করে থাকে – আর মাথা নাড়ে। কিন্তু তার মাথায় খালি ঘুরপাক খায় – সবাই এতো ফ্রি জ্ঞান দেবার উৎসাহ কোথা থেকে পায়! বলতে ইচ্ছে করে – আমাদের সময় হলে আমরা ঠিকই বাচ্চা নিবো – দয়া করে কেউ জ্ঞান দিবেন না। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে আর বলা হয় না।

অন্যদিকে জয়ী তার অফিসে গিয়ে রিশাদকে মেসেঞ্জারে কল দিয়ে – আজকে সন্ধ্যায় তার বাসায় আসার দাওয়াত দেয়। আর মনে মনে বলে – সোহান তোমার আজকের চেহারাটা আমি দেখতে চাই।

সারাদিনে সোহান বেশ কয়েকবার জয়ী’র নাম্বারে ডায়াল করতে গিয়েও আর করেনা । কিন্তু মনটা খুব আকুপাকু করে তার – এই মেয়েটাকে ছাড়া নিজেকে তার খুব অসহায় লাগে।

আগামীকাল পহেলা ফাল্গুন – অনলাইনে দু’জনে পছন্দ করে হলুদ পাঞ্জাবী আর বাসন্তী শাড়ি কিনে রেখেছে। অফিস শেষে ঘোরাঘুরি করবে – কত প্ল্যান করে রেখেছে কিন্তু মাঝখানে রিশাদকে ভার্চ্যুয়াল ফ্রেন্ড বানাইয়া সব মজাটাই জয়ী নষ্ট করব দিলো।

জয়ী তো রিশাদকে পাত্তা দেবার মতো মেয়ে না তবুও কেন জানি রিশাদের সাথে ফ্রেন্ডশিপটা সোহান কিছুতেই মানতে পারছে না। অতিরিক্ত ভালোবাসাতে মনে হয় হারানোর ভয়টাও অতিরিক্ত থাকে।

অফিস শেষে ইচ্ছে করেই বন্ধু জোভানের সাথে আড্ডা দিয়ে সন্ধ্যায় বাসায় ফিরতেই – সোফায় রিশাদকে দেখে খুব অবাক হয়ে যায় ।ভদ্রতার খাতিরে শুকনো হাসি দিয়ে রিশাদের সাথে হ্যান্ডশেক করে। কিন্তু জয়ীকে দেখতে পায় না; কিচেন থেকে রান্নার গন্ধ আসছে তাই সোহান বুঝতে পারে – জয়ী রিশাদের জন্য রান্না করছে।

সোহান রাগে আর ভাবে – নিজের স্বামীর খাবার বন্ধ করে দিয়ে বন্ধু’র জন্য রান্না করা হচ্ছে ; ফ্রেশ হবার বাহানা দিয়ে সোহান নিজের রুমে আসে। পুরো ব্যাপারটা তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। মাথা খুব গরম হয়ে যাচ্ছে তাই শাওয়ার নিতে বাথরুমে ঢোকে।

বাথরুম থেকে বের হলেই জয়ী ডাকতে থাকে – রিশাদ ডাইনিং টেবিলে আসো – আমরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। সোহান মনে মনে বলে – আহা! নিজের বন্ধুর জন্য রান্না করে এখন ওকে দেখাতে আমাকে খেতে ডাকা হচ্ছে কিন্তু সোহান নিজেকে শক্ত করে – আজকে দেখবে – কি করে জয়ী তাই ডাইনিং টেবিলের কাছে এসেই থতমত খেয়ে যায়। রিশাদের পাশে একটা তরুনী বসে আছে। রিশাদ বলে – সোহান ভাই পরিচয় করিয়ে দেই – আমার স্ত্রী মিলি।

সোহান বলে – বিয়ে কবে করলেন?

– চার বছর প্রেম করে তবেই গত বছর বিয়ে করেছি । আপনারা তো কোনো যোগাযোগ রাখলেন না!

সোহান তখন চোরের মত জয়ী’র দিকে তাকায় । জয়ী’র চোখে বিজয়ীর হাসি থাকে।

রিশাদ ও তার স্ত্রী মিলি চলে গেলে – সব গুছিয়ে রুমে ঢুকতেই সোহান জয়ীকে বলে সরি। আমি আসলেই সরি । তোমার কথাই ঠিক – আমার বুদ্ধি একেবারে শূন্যতে নেমে আসছে।

যাও – পাশের রুমে যাও – আমি এখন খুব ক্লান্ত ঘুমাবো। আজ আর কোনো কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।

পরদিন সকালেও কোন নাস্তা নাই বুয়া জানায় আর বলে – খালুজান – খালারে যে আজকে কী সুন্দর লাগছে – একদম কমলা সুন্দরী হইয়া অফিস গেছে।
ঠিক তখন সোহানের মনে পড়ে আজ বসন্ত।

বিকেলে হলুদ পাঞ্জাবী পরে জয়ী’র অফিসের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে সোহান -বাইরে এসেই জয়ী সোহানকে দেখেও মুখ ঘুরিয়ে রিকশা খুঁজতে থাকে ।একটা রিকশা পেয়ে উঠে – আর তখন পাশে এসেই সোহান উঠে পরে। জয়ীর হাতে গাঁদা ফুলের মালাটা দিতে দিতে বলে – শুভ বসন্ত। আগুন সুন্দরীর সাথে প্রেম করে বিয়ে করে সংসার করছি – মনের বাগানে তাই চির বসন্ত । এই বসন্তের ছিটেফোঁটাও আমি কাউকে দিতে চাই না। ভালোবাসি । ভালোবাসি । ভালোবাসি।

রিকশাওয়ালা মামা ঘাড় ঘুরিয়ে বলে – ভাইজান ভালোবাসি বলার দিন নাকি কাইলকা!

জয়ী আর সোহান একে অপরের দিকে তাকিয়ে শব্দ করে হাসতে থাকে।

কলি ফাহমিদা

Read More Stories…

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here