ভালবাসি – পলাতক

0
10

সেনাবাহিনীর প্যান্ট কেটে বানানো আমার একটা ব্যাগ আছে।

চলেন আপনাকে দেখাই। এ পর্যন্ত কাউকেই দেখাইনি ব্যাগটা। আমার বিবাহিত জীবনে বৌয়ের অনুসন্ধিৎসু চোখ থেকে কেবল এই একটি জিনিসই গোপণ রাখতে পেরেছি।

পুরাতন ধূলা জমা বইয়ের পাতার ফাঁক থেকেও আপনার ভাবি লুকিয়ে রাখা। চিরকুটগুলো খুঁজে বের করে ফেলেছে কিন্তু এত্ত বড় ব্যাগটা তার চোখের আড়ালে রাখতে পেরেছি।

আস্তে আসেন। সিঁড়িটা একটু অন্ধকার। হ্যাঁ, ঐ যে সিঁড়ি ঘরটা দেখছেন, ওখানেই ব্যাগটা লুকানো। আপনি একটু দূরেই দাঁড়ান, আমি ব্যাগের ধূলোটা একটু ঝেড়ে নিই।

এই যে পাথরগুলো দেখুন। ওমা, অবাক হচ্ছেন কেন! এরকম নোংরা ব্যাগে এত ঝকঝকে পাথর কিভাবে আসলো তাই ভাবছেন তো? আচ্ছা বলছি।

আর চপলের সাথে আমার প্রথম দেখা হওয়ার দিনে, এই যে এই মার্বেল পাথরের টুকরোটুকু রাস্তায় কুড়িয়ে পাই। আমি সযত্নে সেটা পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিয়েছিলাম। দিনে রাতে যখনই চপলকে মনে পড়তো, আমি পাথরটি বের করে দেখতাম।

পাথরটি একটা আয়নার মত করে চপলের মুখটি ভাসিয়ে তুলতো। ঠিক প্রথমবার তাকে যেরকম দেখেছিলাম, সে রকম করে।

চপলের সাথে যেদিন প্রথম কথা বলেছিলাম। সেদিন এই যে এই নীল পাথরটি কিনে আনি বাজার থেকে। এভাবেই প্রত্যেকটি পাথরের আলাদা আলাদা ইতিহাস গড়ে উঠে জানেন। আপনার কাছে হয়তো সবগুলোকেই একই রকম মনে হতে পারে কিন্তু আমার কাছে একেকটি পাথর একেকটি ঘটনার স্বাক্ষী।

এই যে গোলাপী পাথরটি দেখছেন, এটা সংগ্রহ করেছিলাম যেদিন আমার অনুরোধে চপল কপালে কাজলের ছোট্ট টিপ পরেছিল, শাড়ি পরেছিল। খোলা চুলে নীল শাড়ি আর কাজলের টিপে তাকে কি অদ্ভূত যে লাগছিল, আপনাকে বোঝাতে পারবো না।

সে আমার দিকে রাগ রাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো। “এরকম প্রেমিকদের মত ভাব নিয়ে আর কখনো আবদার করবা না। ভুলে যাবানা যে, আমরা কেবলই বন্ধু।”

এরকম ছোট ছোট বহু কথা জমা আছে এই নোংরা ব্যাগের ভেতর। যখন খুব মন খারাপ হয় তখন আমি চুপচাপ ছাদে চলে আসি। ছাদের দরজাটা আটকে ব্যাগটা নিয়ে বসি। পাথরগুলোর সাথে কথা বলি। ওরা কোন কথার উত্তর দেয় না কিন্তু আমার মন ভাল হয়ে যায়।

ভাবছেন চপলকে এই পাথরের কথা বলেছি কিনা? না বলিনি। বলে উঠা হয়নি। চপলের সাথে প্রথম যেদিন দেখা হলো, সেদিন একটা ময়না পাখিও কিনে এনেছিলাম। খাঁচায় বন্দী পাখিটিকে পরম যত্নে একটা কথা শেখানোর চেষ্টা করতাম। সব সময় তার সামনে গিয়ে বলতাম, “ময়না বলতো, ভালবাসি।”

ভেবেছিলাম এই একটিমাত্র শব্দ শিখলেই পাখিটি চপলকে উপহার দিবো। অনেক প্রচেষ্টায় আর যত্নে ময়নার স্বাস্থ্য ভাল হতে লাগলো কিন্তু কথা সে কিছুতেই শিখতে পারছিল না।

এভাবেই কেটে গেল সাতটি বছর। চপল আমাকে বারবার বলেছে। “আমরা কি পরস্পরকে তুই বলতে পারিনা।” আমি হেসেছি। বলেছি, “তুমি করে বললে বেশি আপন মনে হয়।

” মাঝে মাঝে সে আমার আচরণে বিরক্ত হতো। বলতো। “তোমার আচরণ দেখে মনে হয় আমাকে প্রেমিকা ভাবো। খবরদার বন্ধুত্বটিকে নষ্ট করে দিও না।” আমি তাড়াতাড়ি করে বলতাম, ” আরে দ্যুর, তোমার মত মেয়েকে কেউ ভালবাসবে নাকি, রসকষহীন পাথর একটা!”

আমাদের অন্যান্য বন্ধু-বান্ধবীরা তখন খুব মডার্ন। পরস্পরের সাথে হ্যান্ডশেক করে, তুই তুই করে কথা বলার মাঝে হাজারটা গালি ব্যবহার করে। চপলও কী অনায়াসে অন্য বন্ধুদের । “এই হারামজাদা” এদিকে আয় বলে মডার্ন সাজে! আমি সব সময় হাতে একটা স্কেল বা খাতা কিংবা ডায়েরি রাখতাম।

চপল বা অন্য মেয়েরা হ্যান্ড শেক করতে চাইলে সেগুলো বাড়িয়ে দিতাম। তারপর হয়তো তারা একপাশে ধরতো, আমি অন্যপাশে ধরে ঝাঁকুনি দিতাম। এটাই ছিল আমার অভিনব হ্যান্ডশেক পদ্ধতি।

দেখতে দেখতে মাস্টার্স শেষ হয়ে গেল। সবাই ক্যাম্পাস ছাড়ছে। চপল জরুরী ভিত্তিতে দেখা করতে বললো। আমার ময়নাটা তখনও শেখানো শব্দটি রপ্ত করতে পারেনি। সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ চপলকে এই নির্বাক ময়নাটিকেই দিয়ে দিবো। রাখুক ওর কাছে।

চপলের সাথে গোধূলী লগ্নে দেখা হলো, পদ্মার পাড়ে। তার হাতে একটা নীল খাম। আমার হাতে খাঁচাবন্দী ময়না। চপল আমাকে খামটি দিলো। আমি বললাম, “নীল তো বেদনার রঙ। নীল খাম কেন?”

চপলের চোখটাও ভিজে গেল। “বললো, বেদনাই তো। এতদিন আমরা কত ভাল বন্ধু ছিলাম বলো! আজ বিয়ের কার্ড দিচ্ছি মানে কি বেদনা নয়? তোমার সাথে আর কি সেভাবে দেখা করার সুযোগ পাবো। আমার বর বেচারা যদি সেটা পছন্দ না করে?”

আমি থমকে দাঁড়ালাম পাথরের মত। ময়নার মত নির্বাক হয়ে গেলাম। চপল ভারি গলায় বললো, “পাখিটিকে ওরকম অমানবিকভাবে খাঁচায় বন্দী করে রেখেছো কেন, ছেড়ে দাও।”
আমি বললাম, “তোমাকে দিয়েই মুক্ত করাবো বলে নিয়ে এসেছি। নাও, মুক্ত করো।”

চপল খাঁচার মুখটি খুলে দিলো। কিছুক্ষণ জড়সড় হয়ে বসে থাকার পর ময়নাটি বের হলো। উড়ে গিয়ে বসলো কাছের বকুল ডালে। আর কী অদ্ভূতভাবে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “ভালবাসি। ভালবাসি।”

Ashaduzzaman Jewel

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here