বিয়ের শাড়ি

0
7

বিয়ের শাড়ি

-মা আমি আমার বিয়ের শাড়িটা পুড়িয়ে ফেলি?
নাজিফা অবাক হয়ে বললেন-
-সেকি!কেন?

-কি হবে এই শাড়ি দিয়ে?যে বিয়েটাই নেই সেই শাড়ির অস্তিত্ব রেখেও কোনো লাভ নেই।
অরনিতা সত্যি সত্যিই শাড়িটা উঠানে মেলে ম্যাচে আগুন ধরিয়ে শাড়িটার উপর ছুড়ে ফেললো।নাজিফা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন মেয়ের কান্ড দেখে।মেয়েটার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

দুই মাস আগে তিনি তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।সদ্য বিয়ে করা স্বামী উদয়ের আরেকটি স্ত্রী আছে খবরটা জানতে পেরে মেয়েটা সেই যে শ্বশুরবাড়ি ছেড়ে চলে এসেছে আর সেখানে যাওয়ার নাম পর্যন্ত নেয় নি।এমনকি শ্বশুরবাড়ি থেকে কেউ অরনিতাকে ফিরিয়ে নেয়ার আগ্রহও করে নি।আর তাই মেয়েটা মনে চরম আঘাত পেয়েছে।এখন সে কখন কি করে কিছুই খেয়াল রাখতে পারে না।কিছুক্ষণ পর পর হুটহাট ধরনের পাগলামো শুরু করে।


চোখের সামনে বিয়ের শাড়িটা পুড়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে অনিচ্ছায় চোখ খোসে কখন যে পানি গড়িয়ে এসে গাল ভিজিয়ে দিয়ে গেলো অরনিতা টেরও পায় নি।বিয়ে নিয়ে তার সকল স্বপ্ন,আশা,আনন্দ যদি এই আগুনে পুড়িয়ে ফেলা যেতো তবে সে তা-ই করতো।

বিয়ের পর পর অরনিতা বেশ কিছুবার লক্ষ্য করেছিলো উদয় খুব উদাসীন টাইপের একটি ছেলে।নতুন বিবাহিত বউয়ের প্রতি যেমনটা স্নেহময় হওয়ার কথা তার মধ্যে তেমন কোনো অনুভূতিই নেই।হঠাৎ একদিন আলমারিতে উদয়ের কাপড়চোপড় গোছাতে গিয়েই সে উদয়ের ব্যাপারটা টের পেয়েছিলো।

আলমারির ড্রয়ারে উদয়ের সাথে একটি মেয়ের কিছু ঘনিষ্ট ছবিই ছিলো তার প্রমাণ।বিয়ের দুইদিন পর নিজের স্বামীর সাথে অন্য মেয়ের ছবি দেখে সহ্য করে যাওয়ার ক্ষমতা কোনো মেয়ের নেই।তারপরও মনে একটা সান্ত্বনা দিয়েছিলো অরনিতা।মেয়েটা নিশ্চয়ই উদয়ের প্রাক্তন প্রেমিকা হবে।নয়তো বিয়ের পরও এসব স্মৃতি সে আলমারিতে কেন আড়াল করে রাখবে!কিন্তু সেই ধারণাও ভুল হলো।বিয়ের ছয় সাত দিন পর উদয়ের আচার আচরণ স্পষ্ট করে দিচ্ছিলো সব।উদয় যখন তার আগের বিয়ের কথা স্বীকার করলো তখন অরনিতার মনে একটা ধাক্কার মতো লেগেছিলো।মানুষটা শেষমেশ তার সাথে প্রতারণা করলো!

এই বিয়েটা না করলে উদয়কে ত্যাজ্য পুত্র করা হতো আর সেই ভীতি কাজ করেছে বলেই পরিবারের পছন্দে উদয় অরনিতাকে বাধ্য হয়ে বিয়েটা করেছিলো।উদয় তাকে কখনো তার স্ত্রীর মর্যাদা দিবে না সেটাও সে অরনিতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।অবশেষে নতুন বউয়ের নতুন সংসার না সাজাতেই তাকে তার সবকিছু নিয়ে বাবার বাড়িতেই ফিরে আসতে হলো।

সেদিন থেকে অরনিতা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলো আর কক্ষনো সে ওই বাড়িতে পা রাখবে না।উদয় নামের কোনো ব্যাক্তি তার জীবনে এসেছিলো সেটা হবে তার কোনো একদিন স্বপ্নে ঘটে যাওয়া দুঃস্বপ্ন।

শ্বশুরবাড়ির সবাই উদয়ের ব্যাপারটা জানতো না।মূলত না জেনেই পারিবারিকভাবে তাকে বিয়েটা করিয়েছিলো।অরনিতা জানার পর পর পরিবারের বাকিরাও জেনেছে।কিন্তু অরনিতা সেই বাড়ি ছেড়ে আসার পর থেকে তারাও অরনিতাকে নিতে আসে নি লজ্জায়।মানুষের জীবনে কিছু কিছু পরিস্থিতি এমন হয়ে দাঁড়ায় যে মানুষ সহজে সেটার মুখোমুখি হতে পারে না।লজ্জায় কুঁচকে যায়।

নাজিফা দূর থেকে দাঁড়িয়ে মেয়ের শাড়ি পুড়িয়ে ফেলার দৃশ্য দেখছেন।মনে হচ্ছে আগুনের প্রখর দাবদাহতে মেয়েটা যেন নিজেকে নিজেই পুড়িয়ে ফেলছে।অরনিতা ওখান থেকেই চেঁচিয়ে বলতে লাগলো-
-মা দেখো,আমি শাড়িটাকে খুন করে ফেলেছি।আমার বিয়ের মতো বিয়ের শাড়িটাও মরে গেছে।
নাজিফা মেয়েকে দেখে কাঁদতে লাগলেন।অরনিতা চুপচাপ বসে আছে।উড়ে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে থাকতে তার ভালো লাগছে।

লেখাঃ Polok Hossain

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here