বাবা

কাপড়ের ব্যাগগুলো মায়ের রুমে রেখে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল হিয়া৷ সারাদিন ঘোরাঘুরি করে বিয়ের কেনাকাটা করেছে৷ খুব মাথা ধরেছে৷ কাজের মেয়েকে ডেকে চা দিতে বলল৷ এরমধ্যেই নওশাদের ফোন এলো
‘বলো৷’
‘ভালোভাবে পৌঁছেছো? এগিয়ে দিতে পারলাম না তাই সরি৷’
‘হ্যাঁ৷ ঠিক আছে৷ সমস্যা নেই৷ এমন তো নয় যে আমি পথ চিনিনা৷’

অফিসের ফাইল খুলতে খুলতে বলল—
‘তবুও এটা আমার দায়িত্ব৷’

‘হুম৷ মহাশয়৷ এখন নিজের কাজে মন দিন৷ আমাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আপনাকে নিজের কাজগুলো সুন্দরভাবে করতে হবে৷ বিয়ের পর কিন্তু কয়েকটা দিন আমাকে দিতেই হবে৷ কোন অজুহাত দিলে হবে না৷’
‘আচ্ছা মহারানি মনে থাকবে৷ ওকে বিশ্রাম নাও৷ রাখছি৷’
‘হুম৷’

‘আফা আপনের চা৷’
রেখার দিকে তাকিয়ে বলল—
‘আজকের পেপারটা দেখলাম না এখনও৷ দেয় নি৷’
‘হ৷ আইনা দিমু?’
‘হ্যাঁ দিয়ে যা৷’

পেপার দিয়ে রেখা চলে গেল৷ পত্রিকার হেডলাইন পড়েই মেজাজ বিগড়ে গেল৷
‘কি সব ঘটছে আজকাল? মানুষের নিরাপত্তা কোথাও নেই৷ বাবা সন্তানের মাথার উপরের ছাদ, ভালোবাসার শেষ আশ্রয়৷ আর সেখানেই সন্তান লাঞ্চিত৷ এরচেয়ে কষ্টের কি আছে? আচ্ছা আমার স্বামীও কি এমন হবে? ওকে কতটুকু বিশ্বাস করব? আমার মেয়ের এত শখ কিন্তু মেয়ে হলে তাকে সঠিক নিরাপত্তা দিতে পারব তো? উফ এসব দেখলে আর বিয়ে সন্তানের ইচ্ছে থাকে না৷’
চা না খেয়েই রেখে দিল৷ জানালার পাশের আকাশটা শুভ্র মেঘে ছেয়ে আছে৷
“আচ্ছা মানুষ কেন মেঘের মত শুভ্র হতে পারে না?”

নওশাদের সাথে আজকাল ব্যস্ততার অজুহাতে কথা কমিয়ে দিয়েছে৷ নওশাদও বুঝতে পারছে কিন্তু কোন কারণ খুঁজে না পেয়ে ভাবল সামনে বিয়ে তাই হয়ত মন খারাপ৷

যথাসময়ে বিয়ে হয়ে গেল নওশাদ আর হিয়ার৷ হিয়াকে আজকাল বড্ড অচেনা মনে হয়৷ একদিন অফিস থেকে ফিরে এসে হানিমুনে যাওয়ার কথা বলল৷ তাতেও নিরুত্তাপ হিয়া৷ হিয়ার আচরণ অসহ্য হয়ে উঠছে প্রতিটি মূহুর্তে৷ হানিমুনে গিয়েও অনেকবার বুঝতে চেষ্টা করেছে হিয়াকে৷ কেমন যেন কচ্ছপের মত গুটিয়ে রেখেছে নিজেকে৷ রাতে ডাকল নওশাদ
‘হিয়া কি হয়েছে তোমার? কিছু তো বলো? আমার কোন আচরণে কি তুমি কষ্ট পেয়েছো?’

পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল হিয়া৷
‘আমার কিছু হয়নি৷ তোমার আচরণ তো কষ্ট পাবার মত নয়৷’
‘তাহলে এমন কেন করছো?’
‘কেমন করছি?’
‘কেমন যেন! মনে হয় এ হিয়াকে আমি চিনিনা৷ আমি তোমাকে পেয়েও যেন পূর্ণভাবে পাইনি৷’

‘আমি তো তোমারই৷’
‘জানি তো৷ কিন্তু তবুও…’

‘তুমি নিজেকে আর কারো সাথে ভাগ করছো না তো?’
‘কী?’
‘তোমার জীবনে আমি ছাড়া আর কোন নারী নেই তো?’

‘কাম অন হিয়া৷ আমি সেসব পুরুষদের মত নয় যারা এক নারীতে তুষ্ট নয়৷ আমি তোমাকেই হাজার রুপে ভালোবাসি৷ প্রতিদিন তোমাকে অনুভব করি৷ নিজেকে তোমাতে সপে সন্তুষ্ট হই৷ আচ্ছা হিয়া আমাদের একটা বেবি হলে কেমন হয়? একটা ফুটফুটে মেয়ে?’

বেবির কথা শুনেই চমকে উঠল হিয়া৷
‘বেবি? মেয়ে? কিন্তু তখন তুমিই যদি নরপশু হয়ে যাও? তখন আমি মেয়েকে কি উত্তর দেব? এ সুন্দর পৃথিবীটা ওর কাছে দূর্বিষহ হয়ে যাবে না তো? তারচেয়ে ওকে জম্ম না দেয়াই ভালো৷’

‘কি গো কি ভাবছো? একটা রাজকণ্যা ঘরময় ঘুরে বেড়াবে৷ আমাদের বাবা মা বলে ডাকবে৷ ভেবে দেখ ও আমাদের অস্তিত্ব৷ একটু একটু করে তোমার মধ্যে আমার সত্বা বড় হবে৷ একটা নতুন মানুষ আসবে আমাদের ঘরে৷ ছোট্ট ছোট্ট হাত, পা, চোখ, মুখ দেখতে কত্ত ভালো লাগবে তাই না?’

‘না৷’
‘কি না?’
‘মেয়ে চাই না৷’
‘কেন?’
‘আমার ছেলে চাই৷ আল্লাহর কাছে বলব আমাদের যাতে কোনদিন মেয়ে না হয়৷’
‘ওহ্ আরে ছেলে মেয়ে তো আল্লাহর দান৷ ছেলে মেয়ে যাই হোক আমি তাতেই খুশি৷’
‘হুম৷’

‘কি ব্যাপার মেয়ের কথা শুনতেই হিয়া আৎকে উঠল কেন? সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাব নাকি?’

পেরিয়ে গেল একবছর৷ হিয়া আর নওশাদের ছোট্ট একটি ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে৷ মেয়ে হওয়ার পর অনেক কেঁদেছে হিয়া৷ নওশাদ অনেক খুশি হয়েছিল মেয়ে হওয়াতে কিন্তু দিনদিন খুশিটা বিরক্তিতে রুপ নিচ্ছে৷

হিয়া মেয়েকে এক সেকেন্ডের জন্যও চোখের আড়াল করে না৷ রুমে সিসি ক্যামেরা রেখেছে৷ নওশাদকেও খুব একটা কাছে যেতে দেয় না৷ কোলে নিলেই নিজের কাছে নিয়ে নেয় হিয়া৷ নওশাদ রুমে থাকলে বাথরুমে গেলেও ওর মাকে কাছে রেখে যায়৷ নিজের মেয়েকে ছুঁতে পারে না, আদর করতে পারে না, কাছে যেতে পারে না নওশাদ৷

এক রাতে মেয়েকে নিয়ে মায়ের বাসায় গেল হিয়া৷ প্রয়োজনীয় একটা কাগজ খুঁজতে গিয়ে ড্রয়ারে একটা ডায়েরি পেল নওশাদ৷ কয়েক পৃষ্ঠা উল্টাতেই হিয়ার লেখা
পৃথিবীটা জঞ্জালে পরিপূর্ণ হয়েছে৷ এর মাঝে মানুষগুলোকে চিনতে পারছি না৷ সবাই মানুষ নাকি সবাই জঞ্জাল৷

আবার উল্টালো
নওশাদ আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছি না৷ না তোমাকে নয়, পুরো পুরুষ জাতিকে৷ সন্তান তো নিজের সত্বা তাকে কি করে লাঞ্চিত করে বাবা? সে কি মানুষের কাতারে পড়ে? তাকে তো পশু বলে গালি দিলেও পশুর অপমান হবে৷ আমাকে ক্ষমা করো আমি তোমাকেও বিশ্বাস করতে পারছি না৷

একের পর এক পড়ে যাচ্ছে নওশাদ
আমি চাইনি আমার মেয়ে হোক৷ কেন হলো? এর নিরাপত্তা কে দেবে? আমার স্বামী? সেই যদি নিরাপত্তা হরণকারী হয়? তাহলে মেয়েকে আমি কি উত্তর দেব? এ যুগে মেয়েকে ভালোভাবে বড় করা খুব কঠিন কাজ৷

নওশাদকে আমি হৃদির কাছে আসতে দেই না৷ যদি ওর মধ্যে খারাপ কিছু কাজ করে? আমি রুমে সি সি ক্যামেরা লাগিয়েছি৷ যতটুকু সময় আমি হৃদির থেকে দূরে থাকি তার মধ্যেও যাতে কেউ কিছু করতে না পারে৷ কিন্তু কতদিন হৃদিকে আমি ওর বাবার থেকে দূরে রাখব? এভাবে কি সন্তান বড় করা যায়?

নওশাদ বুঝলো কেন হিয়া এসব লিখেছে৷ বাসা থেকে বেরিয়ে হিয়াদের বাসায় গেল৷
‘হিয়া হিয়া!!’
‘তুমি এখানে? আমার তো কাল যাওয়ার কথা৷ কোন সমস্যা?’

দু’হাতে হিয়ার মুখখানা ধরে বলল
‘এত ভয় কেন হচ্ছে তোমার? আমি পুরুষ, কামের মেশিন নয়৷’
‘মানে?’

‘আমি হৃদির বাবা৷ আমার থেকে ওর সৃষ্টি৷ ও আমার সন্তান৷ ওর প্রতি আমার কামের উদ্রেক কোনদিন হবে না৷ যদি কোনদিন হয় সেদিন তুমি নিজ হাতে আমাকে খুন করবে৷ কারণ আমি সেদিন মানুষ থাকব না৷ অমানুষ হব৷ যে পুরুষ তার নিজ সন্তানকে কামনার দৃষ্টিতে দেখে সে তখন না পুরুষ থাকে, না মানুষ থাকে৷

এদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার অধিকার নেই৷ মারলে পৃথিবী থেকে অন্তত একটা আবর্জনা কমবে৷ এ ধরণের আবর্জনা পৃথিবীতে অনেক কম৷ আমরা শুধু আবর্জনাগুলোকে ধ্বংস করে দেব৷ তাই বলে হাজারো লক্ষ পিতারা পাপী হয়ে যায় না৷ এরা কোটিতে একটা৷ আমাকে এদের কাতারে ফেলো না৷ দেখবে আমি আর তুমি আমাদের হৃদিকে একটা সুন্দর পৃথিবী দেব৷ যেখানে ওর গায়ে যাতে কোন নরকের কীট ছুঁতেও না পারে৷ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি হিয়া৷’

হিয়ার দু’চোখ বেয়ে পানি পড়ছে
‘এ সুন্দর পৃথিবীটা কোন মেয়ের কাছে যেন নরক হয়ে না যায়৷ রক্ষক যেন ভক্ষক না হয়৷ তুমি ওকে সুন্দর একটা পৃথিবী দেবে? যেখানে কোন কলুষতা নেই?’
‘হ্যাঁ৷ আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব আমাদের পরীটাকে সুস্থ পরিবেশ দেয়ার৷ তুমি চিন্তা করো না হিয়া৷’

হিয়া নিজে হৃদিকে নওশাদের কোলে দিল
‘আমার শ্রেষ্ঠ সম্পদকে তোমার হাতে দিলাম৷ একে যথাযোগ্য সম্মান দিও৷’
‘দেবো৷ ভরসা করতে পারো৷’

Writer:  জান্নাতুল জান্নাত 

দ্বিতীয় বিয়ে 

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here