দুর্লভ মায়ের গল্প

0
9

অনিন্দ্য একটা ভালো জব পেয়েছে, মোটা অঙ্কের সেলারিও পায়। অথচ একটা ভালো মেয়ে পায় না, এটা কোনো কথা?

অনিন্দ্যের মায়ের মনে এমন উত্তরহীন প্রশ্ন আসার কারণ, ছেলের কোনো পাত্রী পছন্দ হচ্ছে না। আবার তাকে জিজ্ঞেস করলে বলে, তার কোনো পছন্দের মেয়ে নেই। অনিন্দ্যের মা স্বপ্না ইসলাম ছেলেকে নিয়ে পড়ছেন মহা দুশ্চিন্তায়। তবে কি ছেলেটা আর বিয়ে করবে না? এভাবে চিরকুমার থাকবে? এসব ভাবতে ভাবতে তিনি অনিন্দ্যের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হীরাকে ফোন দিলেন।__
‘কে? হীরা?

– জ্বি খালা, কেমন আছেন?

‘ভালো আছি বাবা। আচ্ছা, অনিন্দ্যের তো কোনো পাত্রীই পছন্দ হচ্ছে না, ওর কি কোনো মেয়ে টেয়ে পছন্দ আছে? এ ব্যাপারে কিছু জানো?’

– জ্বি খালা, জানি। ও আসলে একটা মেয়েকে পছন্দ করে। কিন্তু আপনাকে বলতে সে লজ্জা ও ভয় দুটোই পাচ্ছে। ভয় পাচ্ছে যদি মেয়েটার বাবা সম্মতি না দেন। কারণ তার বাবা ইসলামিক মাইন্ডের। ছেলে মেয়েরা পছন্দ করে বিয়ে করুক, এটা ওনি পছন্দ করেন না। তাই সে আপনাকে জানাতে চাচ্ছে না। আর আপনি প্রস্তাব দিয়ে ছোটো হোন, সেটাও সে চায় না।

‘মেয়েটার ঠিকানা আর বাবার ফোন নাম্বার একটু ম্যানেজ করে দিতে পারবে?’

-জ্বি খালা, পারবো। আর তাকে ভুলেও বলবেন না এসব তথ্য আমি দিয়েছি। জানলে আমার খবর আছে।

তিনি হীরার কাছ থেকে ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে প্রীতির বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন। আজই মেয়েকে দেখতে যাবেন। সন্ধ্যা হবার কিছুক্ষণ আগে অনিন্দ্য বাসায় ফিরতেই বললেন, রেডি হতে। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো__
‘কেন মা?’

– কনে দেখতে যাবো।

‘কোথায়?’

– প্রীতিদের বাসায়।

অনিন্দ্য অবাক হয়ে লজ্জামাখা মুখে বললো__
‘মা, তোমাকে কে দিয়েছে প্রীতিদের বাসার ঠিকানা? নিশ্চয় হীরা? ওখানে গেলে অপমানিত হবে। আমি চাই না তুমি অপমান হও।’

– আমি কিছুই শুনবো না। এখুনি চল। আমার বউমা চাই।

প্রীতির বাবা গেইটের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। হাতে বিশাল বড়ো একটা বাঁশ। তিনি স্বপ্না ইসলামকে গাড়ি থেকে নামতে না দিয়ে ধমকের সহিত বললেন__
‘যেদিক থেকে এসেছেন, ঠিক ওইদিকে চলে যাবেন। আর মিষ্টি গুলো কুকুরকে খাওয়াবেন।’

অনিন্দ্য রাগে দুঃখে কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। জোয়ারের ঢেউয়ের মতো সে প্রতি নিশ্বাসের বিটের সঙ্গে ফুলে উঠছে। তাই সে রাগের চোটে মাকে খুব ঝাড়ি মেরে বললো__
‘কত করে বলেছি; যেও না। এবার হয়েছে? ছেলেকে বিয়ে করানোর সাধ মিটেছে? আজ থেকে এক সপ্তাহর ভেতরে বিয়ের ব্যবস্থা করো। যেখানে মন চায়, সেখানে। আমি রাজি!’

স্বপ্না ইসলাম মহানন্দে অনিন্দ্যকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন__
‘এইতো আমার লক্ষ্মী ছেলে। বুঝলি বাবা, প্রেমের বিয়েতে শান্তি নেই। ওই মেয়েকে আজ আচ্ছা মতো ঝাড়ি দিবি। ওর বাবা যেহেতু এতটাই বদ, নিশ্চয়ই ওর মেয়েও ততটা বদ হবে।’

অনিন্দ্য বাসায় ফিরেই গরমাগরম মস্তিষ্কে প্রীতিকে ফোন দিলো__
‘এই বদ বাবার বদ মেয়ে! আর জীবনেও আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবি না।’

অনিন্দ্যের মুখে এমন অপ্রীতিকর তুইতোকারি শুনে প্রীতিরও মেজাজ বিগড়ে গেলো__
– এই কিপটে, ছোটোলোক। আমার বাবা তুলে একটাও কথা বলবি না। আমরা একটা সমাজে বসবাস করি। আমাদের একটা ইজ্জত আছে। এহ; আসছে পাত্রী দেখতে, তাও সিএনজি নিয়ে! আমার বাবা যে তখন তোদের ঝাড়ুপেটা করে নাই, এটা তোর আর তোর মায়ের কপাল।

‘এহ, তোর মতো ডায়নিকে বিয়ে করতে আমার ঠেকা পড়ছে। তোর চেয়ে তিন গুণ সুন্দরী মেয়েকে এক সপ্তাহের ভেতর বিয়ে করবো। আর তোর তো এক জীবনে বিয়ে হয় কী না সন্দেহ আছে। নাক একটা ড্রামের মতো। চোখ তো পুরাই চায়নিজদের মতো। আর গায়ের চামড়া কী বলবো, এক্কেরে বরিশালের আমড়ার মতো।’

– ওই কুত্তা, ফোন রাখ। এক সপ্তাহের ভেতর আমিও বিয়ে করে দেখাবো, আমি কোটিপতির বউ হবার যোগ্য কী না? তুই তো আস্ত একটা ফকিরপতি। তবুও বিয়ের দাওয়াত রইলো। তুই আর তোর মা সিএনজিতে করে আসিস, শালা ফকির।

‘ওয়াক থু, তোর বিয়েতে। আমার বউ দেখারও দাওয়াত রইলো। মনে করে পার্লারে গিয়ে সেজেগোজে আসবি, নইলে আমার বউর সঙ্গে তোর সেলফি মানাবে না। ‘

ফোনটা রেখে সিটিংরুমে গিয়ে প্রীতি তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বললো__
‘বাবা, পাত্র কানা, কুড়া, ল্যাংড়া যাইহোক। এক সপ্তাহের ভেতরে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করো, আমি বিয়ে করবো। পাত্রের যোগ্যতা লাগবে না, শুধু কোটিপতি হলেই চলবে।’

অনিন্দ্যও তার মাকে জড়িয়ে ধরে প্রীতির ছবি দেখিয়ে বললো__
‘এই ডাইনির চেয়ে তিন গুণ সুন্দরী বউ আমার চাই। এক সপ্তাহের ভেতরে। তোমার চয়েজই আমার চয়েজ।’

আজ অনিন্দ্যের বিয়ে হলো। বিয়ের আগে সে মেয়েটাকে দেখেনি। তার সম্পর্কে কিছুই জানে না। প্রীতির জন্য মন খারাপ হয়ে গেলো, যখন দেখলো বাসরঘরে নতুন বউটা ঘোমটা দিয়ে বসে আছে। এভাবে, ঠিক এভাবে প্রীতিরও বউ সেজে বসে থাকার কথা ছিল। ভাবতে ভাবতে অনিন্দ্য তার চোখের কোণে দুফোঁটা জলের উপস্থিতি টের পেলো। এরিমধ্যে স্বপ্না ইসলাম ছেলেকে বৌমার হাতে অর্পণ করতে বাসরঘরের মধ্যে প্রবেশ করলেন। এসেই খাটে বসে পড়লেন। শুধু বসলেনই না, আরামচে খাটের মধ্যখানে শুয়েও পড়লেন। শুয়ে পড়ে আনন্দের সহিত বলতে লাগলেন__
‘আজ তোমাদের বাসররাত। জীবনের প্রথমরাত। অতি মূল্যবান রাত। ভাবতেছি আজ তোমাদের এই রাতকে কীভাবে মাটি করা যায়। কারো কোনো আপত্তি আছে?’

অনিন্দ্য মুচকি হেসে বললো__
‘কী পাগলামি শুরু করছো তো মা? যাও তো, ঘুমাবো।’

– তোমরা যে ঘুমাবি না, তা আমি জানি। এই রাতে কেউ ঘুমায় না। আমিও এই সময় পার করে এসেছি। বাবা অনিন্দ্য; যাও তো, বাতি অফ করো। বাতি অফ না করলে গল্প জমবে না।

‘কী যে শুরু করলে না মা! তোমাকে নিয়ে আর পারি না।’

– বউমা কে কিছু অজানা তথ্য জানিয়ে দেয়া দরকার। আমার ছেলে কিন্তু বিয়ের আগে একটা প্রেম করেছিল। এবং খুব বড়ো ধরণের ছ্যাঁকা খেয়ে তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল। তা কি তুমি জানো?

অনিন্দ্য তার মায়ের মুখে এসব কথা শুনে খুব অস্বস্তিতে ভুগতে লাগলো। লাজুকতা নিয়ে বললো__
‘মা, এসব কী বলছো। আমার মান ইজ্জৎ আর রাখলে না।’

অনিন্দ্যের মা নতুন বউকে উদ্দেশ্য করে বললেন__
‘বউমা, আমার ছেলেরটা তো জানলে। এবার তোমারটাও জানি? আচ্ছা, তুমি কি বিয়ের আগে কখনো প্রেম করেছিলে?

শাশুড়ির মুখে এমন প্রশ্ন শুনে নতুন বউর লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। ভাবছে, এ কোন পাগলের সংসারে এসে পড়লাম। তখন সে আমতাআমতা করে বললো__
-না মা, আমি কোনোদিনও প্রেম করিনি। আমি কিন্তু আর দশটা মেয়েদের মতো না।

‘মিথ্যে বলো কেন বউমা? আজকালকার যুগে ছেলে মেয়েরা বিয়ের আগে পাঁচ ছয়টা প্রেম করে আবার শোচনীয়ভাবে ছ্যাঁকাও খায়। আর তুমি বলছো করোনি। অবাক হলাম। বুঝলে? সংসার টিকে থাকে সততায় আর বিশ্বাসে। জীবন সংসারে মিথ্যে বলা মানে বিশ্বাসের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়া। আর সন্দেহের ভিত্তিকে যদি মজবুত করো, জীবন সংসারে অশান্তি ছাড়া কিছুই পাবে না। সত্যিটা বলো?’

নতুন বউয়ের রাগ আর জেদ যেন মুখফোটে বের হতে চাচ্ছে। অবশেষে বেরিয়ে গেলো__
‘হ্যাঁ মা, একটা প্রেম করেছিলাম। যার সঙ্গে করেছিলাম, সে একটা কুত্তা, ছোটোলোক। তার মায়েরে নিয়ে সিএনজিতে করে গিয়েছিল আমাকে পাত্রি দেখতে। আমার বাবা ওই ছোটলোকদের বাঁশ দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন।’

অনিন্দ্য ঠিক তখন চিৎকার করে বলে উঠলো__
‘এই, কে রে তুই? তুই প্রীতি না তো? মা, বাতি জ্বালাও। কে সে, এক্ষুণি দেখবো?’

স্বপ্না ইসলাম বাসরঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। অনিন্দ্য প্রীতিকে প্রাণভরে দেখছে, প্রীতি অনিন্দ্যকে নয়নভরে দেখছে। কেউ কিছু বলতে পারছে না। শুধু চোখ দিয়ে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। দুজনেই আর ঠিক থাকতে পারলো না। দুজনেই মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলো। স্বপ্না ইসলাম দুজনের মাথায় হাত বুলাচ্ছেন আর বলছেন__
‘প্ল্যান কিন্তু একা আমার না, প্রীতির বাবারও। মানুষটা অনেক ভালো। আমাকে সহযোগীতা না করলে এই আনন্দঘন মুহূর্ত দেখতে পেতাম না। বাবা অনিন্দ্য, মা প্রীতি, তোমরা গল্প করো। আমি গেলাম। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।’

ঠিক তখন শাশুড়িকে প্রীতি জড়িয়ে ধরে বললো__
‘না মা, তুমি যেতে পারবে না। আজ সারারাত তোমাকে নিয়ে গল্প করবো। আমাদের বাসররাত চির অম্লান করে রাখবো এমন প্রেমময় মাকে দিয়ে।’

অনিন্দ্যও মায়ের পায়ে জড়িয়ে ধরে বললো__
‘মা, তোমার না বাতের ব্যথা। আমি কিন্তু আজ সারারাত তোমার পা টিপে দেবো।’

– তা কি রে হয়? ঘুমা তোরা। অনেক ক্লান্ত দুজন।

তারা দুজনেই মাকে জোরে ধরে খাটে শুইয়ে দিলো। অনিন্দ্য বাতি অফ করে দিলো, যাতে মায়ের ঘুমের ক্ষতি না হয়। দুজনেই মায়ের হাত, পা, মাথা টিপে দিচ্ছে। দূর কোনো এক গ্রাম থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। ভোরও হতে চলছে। দুজনের মধ্যে খুনসুটিও জমে উঠছে। মায়ের চোখও তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে আসছে। অনিন্দ্য প্রীতিকে কানেকানে ফিসফিস করে বললো__
‘প্রীতি, খাটের এ পাশে আসো। মা বোধহয় ঘুমিয়ে গেছেন।’

স্বপ্না ইসলামও তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন ভঙ্গিমায় ফিসফিস করে বললেন__
‘সাবধান, আমি এখনো ঘুমাইনি।’

মায়ের মুখে এ কথা শুনে তারা দুজনেই হেসে উঠলো। এ হাসিটা যে অতি সুখের, যে সুখটা মায়ের মতো দুর্লভ।

 

Writer : রুবজ এ রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here