জুতা বিড়ম্বনা

তিনবার তালি দেওয়া জুতাও চুরি হয়!

মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে, নামাজ শেষে দেখি স্যান্ডেল নেই। আচ্ছা চোরদের মনে কি মায়া দয়া বলে কিছু নেই?

যতটা না দু:খ লাগছে স্যান্ডেল হারিয়ে, তার চেয়ে বেশি দু:খ লাগছে এটার কালি এবং তালি বাবদ কিছুক্ষণ আগে মুচিকে ৩০টাকা দেওয়াতে। কাল রাত্রে কুকুরের দাবড়ানি খেয়ে জুতাটা ছিড়েছিল। স্যান্ডেল জোড়া আর একটু আগে হারালেওতো আমার ৩০ টাকা বেচে যেত! মুচি ও স্যান্ডেল কালি করতে চাচ্ছিল না।

“স্যার এই জুতার আবার কালি করবেন কি?
নতুন একটা কিনে নেন!”

এই বলে নিজের বাক্সের ভেতর থেকে কয়েকট পুরাতন স্যান্ডেল বের করতে লাগলো।

আমি কিছু বলতে যেয়েও থেমে গেলাম। শুধু হেসে কালি করার ইঙ্গিত করলাম।

ব্যাংকের চাকরী ছেড়ে দিয়েছি কয়েকদিন হল। অবসর সময় গুলো কেমন যেন স্থির হয়ে আছে। সকাল থেকেই মন খারাপ। কিছুটা বিষন্নতা কাজ করছে। নুসরাতের সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা।

এর মাঝে তালি দেওয়া স্যান্ডেল্টাও হারিয়ে গেল। এখন খালি পায়ে যাই কিভাবে?
পকেটেও অবশিষ্ট আছে মাত্র ৭০টাকা। এ দিয়ে স্যান্ডেলতো দূরে থাকুক, স্যান্ডেলের তলাও পাওয়া যাবে না।

নিউ মার্কেটের ১নং গেইটে অপেক্ষা করছি। এক জোড়া স্যান্ডেল পছন্দ হয়েছে, দাম দেড়শত টাকা।

অনেক কাকুতি মিনতী করে ১০০ তে রাজি করিয়েছিলাম, কিন্তু পকেটে হাত দিতেই মনে পড়লো আছে মাত্র ৭০টাকা!

নুসরাত দূর থেকে আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সামনে আসতেই –

“এ কি অবস্থা তোমার?

নিজের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, সব ঠিক-ই তো আছে!

এতদিন চাকরীর সুবাদে স্যুট বুট পরে হয়রান। তাই ফতুয়া এবং ট্রাউজার সাথে ছেড়া একজোড়া স্যান্ডেল পরে বের হয়েছিলাম। ভাগ্য খারাপ থাকলে যা হয়, স্যান্ডেল জোড়া এখন আর সাথে নেই, এই আর কি!

“আরে বলোনা, বাসা থেকে বের হয়ে মসজিদি গিয়েছিলাম। ওখান থেকে বের হয়ে দেখি স্যান্ডেল জোড়া চুরি হয়ে গেছে!”

“বাহ, দেখছো! চোরেও তোমার উপর দয়া করে চুরি করছে? আল্লাহ জানে, আর না হয় কতদিন ওইটা পরে তুমি আমার সাথে দেখা করতে আসতা। আর লোকজন আমাকে দেখে হাসতো! এইবার যদি তোমার একটু বুদ্ধি হয়!, কিন্তু তোমারতো সেই বুদ্ধিটুকু আর হবেনা! খবিশ কোথাকার!”

চুপ করে বকা শোনার মজা আলাদা। নুসরাত রেগে গেলে ওকে ভয়ংকর রকমের সুন্দর লাগে। যে সৌন্দর্য আমাকে স্তব্ধ করে দেয়। যে সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। শুধু অপলক দৃষ্টিতে দেখতে ভালো লাগে।

“তোমার মত ক্ষেতকে কি দেখে যে পছন্দ করেছিলাম? আল্লাহ ভালো জানেন। তোমার চাইতে তো রাস্তার পাশের ঐ টোকাই টাও বেশি স্মার্ট।”

তাকিয়ে দেখি পাশে আধা স্পাইক করা একটা ছেলে পরিত্যাক্ত বোতল সংগ্রহ করছে। ছেলেটা দেখতে আসলেই খারাপ না। শুধু যত্ন নেওয়ার সময় পায় না।

এরি মাঝে আমার স্তব্ধতা ভাঙিয়ে দিয়ে বললো-

“চল!”

কোথায়?

“যেতে বলেছি যাবা, এত বেশি কথা বল কেন?!”

শহরের নামকরা এক জুতার শোরুমে ঢুকেছি! শোরুমের গার্ড নুসরাতের জন্য দরজা খুলে হাসিমুখে লম্বা সালাম দিলেও তার ভাবভঙ্গি বলে দিচ্ছে আমি যেন বাইরে থাকি। এখানে ভিক্ষুকদের প্রবেশ নিষেধ টাইপ কোন প্রবেশবার্তা লাগিয়ে রাখা গেলে সে মনেহয় তাই করতো এবং আমাকে পড়ার ইংগিত দিত।

বিক্রয় প্রতিনিধিরাও আড়চোখে তাকিয়ে আছে। অত্যন্ত অনীহা নিয়ে আমাকে জুতা দেখাচ্ছে।

শপিং শেষে বাসায় ফেরার পথে আমার বন্ধু রনির সাথে দেখা। কথা চলার মাঝে দেখতে পাই আমার হারানো স্যান্ডেল ওর পায়ে।

“কিরে এই স্যান্ডেল কোথায় পেলি?

“আরে বলিসনা, আজ দুপুরে মসজিদে নামাজ পড়তে যেয়ে আমার নতুন জুতা চুরি হয়। বাইরে যেই গরম। তাই বেছে বেছে সবচাইতে পুরাতন জুতাটাই গেইটের সামনে থেকে পরে চলে এসেছি। এম্নিতেই এই কিপটা ব্যাটার স্যান্ডেল পাল্টাইতে হইতো! তাই তার আগে আমার উপকারটুকুই নাহয় করলো।”

এখন এইটার মালিকানা দাবি করতে গেলে ইজ্জতের ফালুদা হবে। তাই চোখের সাম্নেই নিজের পুরাতন ভালোবাসাকে বিদায় দিলাম।

Abu Salehin

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here