এখন তার ভাবী লাগবে – নাহিদ হাসান নিবিড়

আমার ছোট বোন

ইকলি দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেছে। ছোট ছোট পা দুটো আর ছোট নেই। চুলগুলো বড় হতে হতে হাটুতে এসে ঠেকেছে। মাঝে মধ্যে চুল ছাটার জন্যে সে ভীষণ ছটফট করে। আমার কারণেই কাটতে পারে না। কেন কাটবে? আমার ছোট বোন কি সবার মতন?

শহরে ধুলো-বালি, নোংরা পরিবেশের অজুহাত দিয়ে মেয়েরা চুল ছেটে ছেলেদের বাবড়ি চুলের মতন রাখছে। মাঝে মধ্যে রাস্তায় হাটতে গিয়ে শার্ট-প্যান্ট পরা মেয়েদেরকে দেখে ঠিক বুঝি না এ কি মেয়ে নাকি ছেলে। একবার তো মহা বেইজ্জতি হয়েছিলাম। একজনকে জিজ্ঞাস করলাম, ভাই ভূতের গলিটা কোনদিকে? তিনি বিক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ভাই না বোন। উত্তর না দিয়েই সে চলে গেল। আশে-পাশের কিছু উঠতি বয়সের ছেলে-ছোকরা এতে যে কি আনন্দ পেল! তারা হাসাহাসিতে গড়াগড়ি খেল।

ইকলির পুরো নাম ইশরাত কবির লিসা। আমি ওকে ছোট থেকে আদর করে ইকলি বলে ডাকি। ইকলি বলে ডাকতে ডাকতে এখন মনে হয় এটাই ওর আসল ডাক নাম। মা যখন লিসা বলে ডাকাডাকি করে, নামটা বেশ অপরিচিত মনে হয়।

ইকলি আমার মেয়ের মতন। আব্বা যখন মারা গেল, ইকলি তখন খুব ছোট। ক্লাস টুতে পড়ে। বাবা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেলেন। আম্মা আব্বার শোকে কাঁদতে কাঁদতে বার বার মূর্ছা যেতে লাগলেন৷ ফুপুরা কাঁদছে, কাকাতো বোনেরা কাঁদছে। পুরো বাড়িতে কান্নার রোল পরে গেছে।

ইকলি এসে আমাকে জিজ্ঞাস করল ভাইয়া সবাই কাঁদছে কেন? আমি চোখের জল মুছে ইকলিকে কোলে তুলে নিয়ে ছাদে চলে গেলাম। আমার বুকের ভেতরটা আব্বার শোকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, মনের অজান্তে বার বার কান্না চলে আসছিলো কিন্তু আমি কাঁদিনি। ইকলিকে নিয়ে ছাদে বসে গল্প করেছি। গল্পের ফাঁকে ফাঁকে হেসেছি। অভিনয়ের হাসি।

আব্বাকে যখন কবরে শোয়ালাম, বার বার মনে হচ্ছিলো, আব্বা আমাকে ডাকছেন। আমি বার বার ফিরে তাকালাম। আব্বার কন্ঠ স্পষ্ট শুনতে পেলাম- ‘লিসা আর তোর মাকে দেখে রাখিস বাবা।’

আব্বা আম্মাকে ভীষণ ভালোবাসতেন। সবসময় হাসি-তামাশা করে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে রাখতেন। ইকলি ছিলো পরিবারের মধ্য মণি। আব্বার মৃত্যুর পর আর কোন হাসাহাসি হয় না। আব্বা-আম্মার মিষ্টি ঝগড়া হয় না। আম্মা একদম চুপচাপ থাকেন। কারও সাথে তেমন কথা বলেন না। ইকলি আমাকে জিজ্ঞাস করত ভাইয়া আব্বা কই? আমি বলতাম আব্বা অনেক দূরে গেছেন।

–আব্বা কবে আসবে ভাইয়া?

–তুমি যখন বড় হবে, তখন আসবে।

আম্মা স্বাভাবিক হবার আগ পর্যন্ত ইকলি আমার সাথে ঘুমাতো। ইকলি এতো গল্পের পোকা ছিলো! গল্প না শুনলে ও ঘুমাতোই না। ইকলির জন্যেই আমাকে রোজ রোজ একটা করে নতুন গল্প বানাতে হতো। এক গল্প দুবার শোনানো যেত না, ইকলির স্মৃতিশক্তি ছোট থেকে খুব ভাল। এক গল্প দ্বিতীয় বার বলতে গেলে ইকলি বলত- ভাইয়া এই গল্প আগে বলেছ। নতুন গল্প বল।

ইকলি অপেক্ষা করে থাকত কবে সে বড় হবে। বড় হতে হতে ইকলি বুঝতে পেরে গেছে আব্বা যেখানে গেছেন সেখান থেকে আর কখনো কেউ ফিরে আসে না।

কলেজের পর পড়াশোনা আর করতে পারিনি। আমাদের পাইকারি মুদি দোকানের ব্যবসায়। সারাদিন সময় দিতে হয়। একদিন না গেলে দোকানের কর্মচারীরা নানা রকম গন্ডগোল পাকিয়ে বসে থাকে। আব্বা যদি ব্যবসায় না করে চাকরি করতেন তবে পরিবার নিয়ে পথে নামতে হতো।

প্রতিদিন সকালে দোকানে যাবার সময় ইকলিকে সাথে নিয়ে বের হোতাম। ইকলিকে জিজ্ঞাস করতাম- ইকলি কি নিবে? চিপস নাকি চকলেট? ইকলি বলত কিছু লাগবে না আমার। আমি জিজ্ঞাস করতাম কেন? তোমার কি ওসব খেতে ইচ্ছা করে না? ইকলি চিন্তিত মুখে বলত- করে তো! কিন্তু তোমার কাছে কি টাকা আছে?
এই ছোট্ট মেয়ে ভাইয়ার কাছে টাকা আছে কিনা ভাবত কেন? এতোটুকুন বয়সের বাচ্চারা কি টাকার মানে বোঝে? বোঝার কথা না।

ইকলিকে স্কুলে দিয়ে আমি চলে যেতাম দোকানে। স্কুল ছুটির পর আবার ইকলিকে বাসায় দিয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে ইকলি আমার সাথে দোকানে গিয়ে কর্তৃত্ব কায়েম করত।

দেখতে দেখতে স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়ে ইকলি বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে গেল। প্রতিবছর ওদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সবাই মিলে পিকনিকে যায়, কিন্তু ইকলি যায় না। আমি এতো করে বলি, যাবি না কেন? সবাই যাচ্ছে তুইও যা। ঘুরে আয়। ইকলি বলে- সাতদিন নাকি সে আমাদের ছাড়া থাকতে পারবে না।

এ কেমন কথা! যেই মেয়ে সাতদিন আমাদের ছেড়ে থাকতে পারবে না, সে সারাজীবন অন্যের বাড়ি সংসার করবে কি করে? আমরাই বা ইকলিকে ছেড়ে রবো কি করে? ইকলিকি সত্যি একদিন অন্যের ঘরে চলে যাবে? রাতে আমার বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় বসে রবে না? বাসায় এলে বলবে না, ভাইয়া যাও হাত-মুখ ধুয়ে আসো- খাবার দিচ্ছি?

ক্ষণস্থায়ী জীবনে কত কত মায়া ভুলে পথ চলতে হয়। হয় তো একদিন সত্যি ইকলি বরের বাড়ি যাবে। আমার জন্যে আর অপেক্ষা করে রবে না। বাবার শোক যেভাবে কাটিয়ে উঠেছি অথবা বাধ্য হয়েছি হয়তো ইকলি চলে যাবার পরও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাব।

দোকানের হিসাব শেষ করে বাড়ি ফিরছি। মনে কত কত অদ্ভুত প্রশ্ন জন্ম নেয়। ভবিষ্যত সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না, অথচ ভবিষ্যতের সব ভাবনা নিয়েই পরে থাকি।

বাড়ির দরজায় টোকা দিতেই ইকলি এসে দরজা খুলে দিলো। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। বিদ্যুৎ আছে তাহলে ঘরের বাতি নেভানো কেন?

–ইকলি এই ইকলি! বাতি নিভিয়ে রেখেছিস কেন?

–চুপ, কোন কথা বলবে না। চুপচাপ বসে থাকো।

–কি হয়েছে তা তো বলবি।

–সব জানতে পারবে, একটু খানি অপেক্ষা কর।

আমি বসে রইলাম, ইকলি এসে চোখে একটা কাপড় বেঁধে দিয়ে বলল, খুলবে না- ঠিক আছে?

–কি হয়েছে বলবি তো?

–একটু খানি অপেক্ষা কর।

হঠাৎ ঘরের বাতি জ্বলল, তাতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। চোখে ইকলি কাপড় বেঁধে দিয়ে গেছে। ঘরের ভেতর বাতি জ্বলছে এতটুকুই কেবল বোঝা যাচ্ছে।

মিনিট দশেক পর ইকলি এসে আমার হাত ধরে বলল, উঠো। আমি উঠলাম। হাত ধরে ডায়নিং টেবিলের সামনে গিয়ে চোখের কাপড় খুলে দিলো। আমি বললাম- কি ব্যাপার রে?
ইকলি বলল, ভুলে গেছ তাই না? আমি জানতাম তুমি ভুলে যাবে। আজ তোমার জন্মদিন, এখন মনে পরেছে? নাও কেক কাটো।

ইকলি ঠিকই বলেছে। জন্মদিনের কথা সত্যি ভুলে গিয়েছিলাম। কেক কাটা শেষ করে ইকলিকে বললাম, চল ছাদে যাই। অনেক দিন হলো ছাদে যাই না।

ইকলি আর আমি ছাদে আসলাম। রাত প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে। ইকলি আমার কাঁধে মাথা রেখে হাত ধরে হাটতে হাটতে বলল-

–ভাইয়া! বিয়ে-শাদী কিছু করবে না তুমি?

–তোকে বিয়ে দিয়ে তবেই আমি বিয়ে করব।

–তাড়িয়ে দিতে চাইছো? বোঝা হয়ে গেছি?

–ধুর পাগলি! আমি কি তাই বলেছি? বিয়ে দিতে হবে না?

–না হবে না। ভাতিজা-ভাতিজির মুখ না দেখে বিয়ে আমি করছি না। আমাকে একদম বঞ্চিত করবে না। আমি ভাবীর সাথে ঝগড়া করব। তোমার বাচ্চাদের সাথে মারামারি করব।

–ঠিক আছে করবি। আমি কি বারণ করেছি? চল ঘরে চল, রাত অনেক হলো।

কয়দিন খুব ব্যস্ততায় কাটল। বছরের মাঝা-মাঝি সময় দম ফেলার সময় পাওয়া যায় না। বুঝে শুনে দোকানে মালামাল স্টোক করতে হয়। এই দিকে ইকলি আমাকে বিয়ের জন্য জ্বালিয়ে মারছে। তার নাকি জলদি একটা ভাবী লাগবে! সে ফুপি হতে চায়। ভাতিজা-ভাতিজিদেরকে নিয়ে হৈচৈ করতে চায়। কয়েকদিন থেকে একেক জনের ছবি এনে হাজির হয়ে দেখিয়ে বলছে, দেখ তো ভাইয়া পছন্দ হয় কি না।
কি অবাক ধরণের কথা, ভাইয়া তার জন্যে যথেষ্ট না!

এখন তার ভাবী লাগবে!

নাহিদ হাসান নিবিড়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here