এক টুকরো ভুল – নাহিদ আহমেদ

অনেকদিন পর গ্রামে ফিরব।

প্রায় ৬ ডিজিটের বেতন আসে পকেটে। তাই বিমান যাত্রা করা। ডিপার্চার টাইম দুপুর ১২ টা আর এখন সময় সকাল সাড়ে ১১ টা। সিডিউল ডিলে না হওয়ায় এখনি প্লেনের দিকে রওনা হতে হলে। সামনে বড় একটা বন্ধ আছে। তাই আজকে মানুষ অনেক। একটা বড় লাইন লেগে গেছে বলা যায়। একটু সময় নিয়ে সবার শেষে গিয়ে উঠলাম। টিকিট কেনার সময় কাউন্টারে বলেছিলাম জানালার পাশে বসার সুযোগ দিতে। কিন্তু তিনি আমাকে বললেন

-জানালার পাশের সিট তো দূরে থাক। জানালার পাশের একটা সারিতেও সিট নেই।
কথা শুনে আর কিছু বলার রইল না। একটু থেমে বললাম যা আছে তাই দিন।
একটু পর লোকটি আমার দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলল
– আপনার ভাগ্যটা ভাল।
– জানালার পাশে সিট পাওয়া গেছে বুঝি?
– না। তবে জানালার পাশেরটার পাশের সিট পাওয়া গেছে।
কিছুক্ষন আগে কেন্সেল করল।

– তাহলে আর কি ভাগ্য ভাল বলা যায়। যাক, যা পাওয়া গেছে তাই দিন।
সিটটা পাওয়া আদৌ ভাগ্যের ব্যাপার কিনা তা আমি তখনো জানিনা।
যাই হোক, যথারীতি সিটের কাছে গিয়ে দেখলাম আমার সিটটি খালি পরে আছে। জানালার পাশের সিটটিতে একটি মেয়ে। তাই রিকুয়েস্ট করে সিটে বসার সুযোগ পাওয়া যাবে না। যদিও মেয়েটার চেহারা দেখা হয়নি। অনেক মেয়ের চেহারা দেখে বোঝা যায় তার মনে মায়া দয়া আছে কিনা। কিন্তু জানালার পাশের সিট ছাড়ার জন্য সেই সুত্র প্রযোজ্য নয়।

নিজের ব্যাগ উপরের কেবিনেটে রেখে সিটে বসতে গিয়ে সেই মেয়েটাকে দেখতে পেলাম। কেন জানি মনে হল আমার শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেছে। ধপাস করে সিটে বসে পরলাম। তখন মেয়েটি আমার দিকে তাকাল আর তারও বোধ হয় আমার মত শ্বাসরুদ্ধ হয়ে গেছে৷
নিরবতায় মুখর হয়ে আছে চারদিক। যদিও প্লেনের অন্য যাত্রিরা তাদের কথাবার্তা চালালেও আমি যেখানে আছি সেখানে নিস্তব্ধতাটাই বিরাজ করছে ।

মেয়েটি আমার পুর্ব পরিচিতা। শুধু পুর্ব পরিচিতা তাই একটা সময় ছিল যখন ফেসবুক নামক যাদুর বাক্সে তার সাথে কথা বলতে বলতে ঘন্টার পর ঘন্টা পার হয়ে যেত। কি কথা বলতাম তা জানি তাই কিন্তু একদিন কথা না বললে ভাল লাগত না। সময় কাটত না। নেশা হয়ে গিয়েছিল। তার প্রতি অদ্ভূত এক দুর্বলতা প্রকাশ পেত কথা বলার মাঝে। কিন্তু তখনও বুঝতাম না এটা তার প্রতি ভালবাসা নাকি মোহ। সারাদিন যেভাবে হোক চলে যেত কিন্তু সন্ধ্যার পর আর মন টিকত না।

আমার ফ্রেন্ডসার্কেলের অনেকের সাথে ফেসবুকে মেয়েটি কথা বলত। অনেকে বলত যে এই মেয়ের পিছে অনেক ছেলে ঘুরে। অনেকের সাথে কথা বলে৷ অনেকে নাকি প্রোপোজ পর্যন্ত করেছে। অনেকের কাছে এমনও শুনতাম সে নাকি একটা ছেলের সাথে রিলেশনে ছিল। এগুলো শুধু শুনতাম কিন্তু গুরুত্ব দিতাম না। কারন তখন প্রেম নামক উদ্ভট বেপারটার প্রতি আগ্রহ দেখাতে ইচ্ছে করত না।এর চাইতেও মজার ব্যাপার হল মেয়েটার প্রতি দুর্বলতা যে আসলে মেয়েটার প্রতি আমার ভালবাসা সেটা আমি বুঝতে পারিনি তখনও।

 

এরমধ্যে একটা খুব খারাপ ঘটনা ঘটল৷
একদিন আমার এক স্কুলফ্রেন্ড নাম লাবন্য জিজ্ঞেস করল
– তুই নাকি আফি কে পছন্দ করিস? (মেয়েটার নাম ছিল আফি। জান্নাতুল রাইসা আফি)
– (হকচকিয়ে) কোন আফি?
– ন্যাকা সাজা লাগবে না৷ যে আফির সাথে তুই সারাদিন কথা বলিস। সেই আফি।
– তুই চিনিস কিভাবে?
– ও আমাদের ভার্সিটিতে পরে আমাদের ব্যাচে। ওর বান্ধুবিরা তো বলে তুই নাকি ওকে খুব পছন্দ করিস। আমি প্রথম শুনে তো অবাক হয়ে গেছিলাম যে আমাদের দীপু একটা মেয়েকে পছন্দ করে তাও আমাদের ভার্সিটির এক মেয়েকে ।


এই কথা শুনে আমি কিছুটা ভয় পাই৷ কারন লাবন্য আমাদের বিল্ডিংয়ে থাকে। আর ও যদি জানতে পারে যে আমি কোনো মেয়েকে পছন্দ করি তাহলে সেটা চারিদিকে ছরিয়ে যাবে। আর সেখান থেকে যদি আমার মা- বাবার কানে আসে কথাটা তাহলে আমি শেষ। তাই গভীরে চিন্তা না করে।
– নারে। ওই মেয়েকে আমি পছন্দ করতে যাব কেন।
– তুই যেভাবে ওর সাথে চ্যাট করিস তাতে তো এটাই বোঝা যায়।
– আরে এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। আর ওইরকম বাজে স্বভাবের মেয়েকে আমি কিভাবে পছন্দ করি বল। (বলে একটা দীর্ঘশ্বাস নিলাম।

– বাজে স্বভাবটা কি ওর?
– অনেকে ছেলেদের সাথে কথা বলে প্রেম করে। এইগুলো।
– ওহ আচ্ছা।
এই কথা বলে লাবন্য চলে গেল।

 

আমার বলা বাজে স্বভাব কথাটা আকারে যে কি রূপ ধারন করতে পারে তা কখনো ভাবিনি।
সেদিন রাতে কথা বলার সময় আফিকে জিজ্ঞেস করি যে
– তুমি কি লাবন্যকে চেনো?
– হ্যা। ও তো আমার ব্যাচমেট। আর ও আমার খুব ভাল ফ্রেন্ড। তুমি চেনো কি করে?
– (একটু ভড়কে গিয়ে বললাম) ও আমার স্কুল ফ্রেন্ড আর আমরা একই বিল্ডিংয়ে থাকি।
– ওহ, আচ্ছা।
-তোমার ফ্রেন্ড্ররা নাকি এটা বলে যে আমি নাকি তোমাকে পছন্দ করি।
– এটা লাবন্য বলেছে?
– হ্যা।
– এইটা শুধু ও নিজেই বলে।

 

আচ্ছা তুমি কি বলেছ?(আফি)
– আমি না বলেছি। কারন তুমি আমার খুব কাছের বন্ধু। এর বেশি আমি কিছু ভাবিনি। ( কথা গুলো হয়ত আমার মন থেকে বের হচ্ছিলো না । কথা গুলো আমার ব্রেইন থেকে আসছিলো। তাই আসল অনুভূতি প্রকাশ পায় নি)
– আচ্ছা ঠিক আছে। বাই।
এরপর আর ওইদিন কথা হয় নি।
পরে কয়েকদিন আর কথা হয় নি ওর সাথে।

২/৩ দিন পর হঠাৎ একটা মেসেজ আসে আফির থেকে
– ওই তোর সাথে কথা আছে।
( মেসেজটা ঝড়ের পূর্বাভাসের মত লাগল। কারন এতদিন আফির সাথে কথা বলার মধ্যে কখনো তুই বলতে শুনিনি। এমনকি তুমি করে বলা শুরু করে যখন তার সাথে প্রথম দেখা হয়।)
– বলো।
-তুই লাবন্যকে কি বলছিস? আমার স্বভাব খারাপ? আমার কোন স্বভাবটা খারাপরে তোর কাছে বল৷
– আমি তো ওই কথা বলছি যাতে তোমাকে আর আমাকে নিয়ে কোনো ভুল ধারণা না জন্মে।
– বাজে স্বভাবের মেয়ে বলবি। বাজে মানে বুঝিস?
( এখন মনে হচ্ছে যে নিজের ভাল করতে গিয়ে আফির ক্ষতি করে ফেলেছি। লাবন্যটাত উপর খুব রাগ উঠছে। বোকা মেয়েটা কি বোঝেও এই কথা বলা উচিত না। )
– আমি কখনো ওইরকম ভেবে তোমাকে মিন করিনি।। আই অ্যাম সো সরি ফর দিস। প্লিজ মাফ করে দেও।
– সরি বললেই সব শেষ হয় না। আজ থেকে তুই আমার সাথে কোনো কথা বলবি না।

আমি আর রিপ্লাই দিতে পারিনি। কারন আমি তখন আফির ব্লাকলিস্টে। আফির রাগটা অস্বাভাবিক ছিল না। যুক্তিযুক্ত ছিল। তাই কিছু বলি। ২/৩ দিন পর নিজেই অস্থির হয়ে পরি। মেসেজ দেওয়ার সাহসটাও তখন ছিল না। তাই ওর প্রোফাইল ঘাটাঘাটি করতাম। লাবন্যকে অনেকদিন বকেছি। কিন্তু ওর দোষটাও দিতে পারছিলাম না। একদিন লাবন্য বলল আফি অন্য একটা ছেলের সাথে রিলেশন করছে। আমার সাথে ওর রাগারাগির পরপরই ও নতুন রিলেশনে যায়। আমি আর কিছু বলিনি
প্লেনে খাবার দিচ্ছে। আমি আফির খাবারটা আফির দিকে এগিয়ে দেই। তখন কথা বলার চেষ্টা করি কিন্তু গলা থেকে বের হয় না

একটু পর সাহস করেই কথা বলার চেষ্টা করলাম,
– হ্যালো
– হ্যালো।
– কেমন আছো।… আই মিন আছেন?
– ভালো৷
ভালো বলার আগে একটা দীর্ঘশ্বাস নিল। এই দীর্ঘশ্বাস সেইদিনও ছিল যেদিন আফির ঝামেলা হবার পর প্রথম ওর সাথে কথা হয়। সেদিন সরাসরি মেসেজ দিয়েছিলাম।
– কেমন আছেন?
– হুম ভাল। (রিপ্লাইটার মধ্যে এক দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে ছিল আর তা অনুভব করা যাচ্ছিল )

 

আফির সাথে কথা বলা বন্ধ হবার পর বুঝতে পারি ওর প্রতি দুর্বলতা ঠিক কতটুকু। স্বাভাবিক জীবন যাপন করলেও মনের অবস্থা ছিল অস্বাভাবিক। লাবন্যের থেকে জানতে পারি যে আমি আফিকে পছন্দ করি কি না? এই কথাটা লাবন্য নিজ থেকে জিজ্ঞেস করেনি। ওকে আফি জিজ্ঞেস করতে বলেছিল। কথাটা শুনে কেন জানি খুব হাসি পেয়েছিল। কারন যদি আফি নিজের থেকে আমাকে প্রশ্নটা করত তাহলে এত কিছু হয়ত হত না। তখন আমার উত্তরটাও ভিন্ন হত আর ব্যাবধানটাও কম হত।

মেয়েদের মনে যে কি থাকে তা বোঝা কঠিন। তখন আফির মনে কি ছিল তা যানতাম না। কিন্তু আমার মনে যে ওর জন্য ভালবাশা তৈরী হয়েছে তা জানতাম। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম এবার বলব আমার মনের কথা। যদিও তখন সে স্বাধীন প্রেমসুত্রে আবদ্ধ। তাই দ্বিধার দেয়ালে আবদ্ধ হতে হয়। অনেক বন্ধুরা তখন সাজেশন দেয় ফুটবল গোল থাকা স্বত্ত্বেও গোল দিতে। তখন আফির সাথে টুকিটাকি কথা হতো কিন্তু তা আগের মত ছিল না। নানান ইঙ্গিতে বুঝানোর চেষ্টা করতাম আমার প্রেম। কিন্তু পাত্তা পেতাম না। একদিন সাহস করে জীবনের প্রথমবারের মত প্রোপোজ করলাম। কিন্তু তার কোনো রিপ্লাই পেলাম না। কারন ততক্ষনে সে আমার সাথে যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ করে দিল……।

তখন কষ্ট পেলাম। ব্যার্থ প্রেমিকের মত ন্যাকা সাজলাম৷ আবার কথা বলার চেষ্টা করলাম, অপমানিত হলাম। একটা পর্যায় গিয়ে বুঝলাম যদি না থাকে নসিবে, তাহা আসিবেনা কোনো মতে ফিরায়ে।
ঠিক এই মুহুর্তে যখন আমি আফির পাশে বসে আছি তখনও মনে ইচ্ছা হচ্ছে বলতে যে তোমার জন্য মনের দুয়ার আজও খোলা আছে ।

 

মন চাইছে তারে কাছে টেনে নিতে নিতে কিন্তু সময় তা দিচ্ছে না। কথা বলা শুরু করলাম আফির সাথে। নতুন করে অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করছি যেগুলো আমি আগের থেকেই জানতাম। কথা বলার সময় আপনি করেই বলতেই আমার ভাল লাগে। এই আপনি বলার মধ্যেও একটা ভালবাসার অনুভুতি পাই। কারন প্রতিবার আপনি করে বলায় আফির মধ্যেও কোনো এক অনুভুতির প্রকাশ পায় আর এটাই আমার আজ ভাললাগে। কথার মাঝেই হঠাৎ জিজ্ঞেস

– আপনার রিলেশনের কি খবর?
-(হঠাৎ রিলেশন শব্দটা শুনে মনে হল অনেকটা অবাক হল। কিন্তু একটু পরেই বলল ) ভালই।
– এখন কোথায় যাচ্ছেন?
– বিয়ে করতে।
– মানে!
– এতে অবাক হবার কি হল।
-( অবলা ছেলের মত বলতে হল) না এমনি।
– আমি জানি তুমি আজও হয়ত সেই কথাই বলতে চাইছ যেটা তুমি সঠিক সময় বলতে পারনি। আজও সেই সঠিক সময় নয় যে তুমি বলবে।
– হয়ত তাই। সময়টাই জীবনের সব পালটে দেয়।
– হ্যা। তাই।
– আচ্ছা। লাবন্যকে দিয়ে কেন জিজ্ঞেস করালে যে আমি তোমাকে পছন্দ করি কিনা?
– (একটু নিরব থেকে) জানিনা।
– কখনো কি আমার জন্যে তোমার মনে একটু পরিমানেও জায়গা ছিল কি।
– না।
– একটু আমার দিকে তাকিয়ে বল?
– পারবনা।

 

এই বলে সে ওয়াশরুমে চলে গেল। এরপর আর কথা বলার মত অবস্থা ছিল না।

প্লেন ল্যান্ড করার পর সবাই নেমে গেল। আফিও তখন ছিল না । কখন গেছে খেয়াল নেই। বিমানবালার ডাকে মনে হল জ্ঞান ফিরল দুনিয়ায় । গুছিয়ে নেওয়ার সময় একটা মোছড়ানো কাগজ দেখি। জানিনা কেন সেটা তুলে নিলাম । বিমান থেকে বেরিয়ে এলাম। এবার যে যার মত নিজ নিজ পথে চলে গেলাম।
গাড়িতে বসে কাগজটা হাতে নিলাম । সেখানে যা ছিল ,

 

” তোমার প্রতি আমার মনে জায়গা ছিল কিনা সেটা বোঝার ক্ষমতা তোমার নেই । ৫ দিন পর আমার বিয়ে। এখন আমি তোমার মায়া জড়াতে চাই না। আজকে তুমি যে সিটটাতে বসে আছো সেটাতে আমার হবু বরের বসার কথা ছিল । কিন্তু কাজের কারনে সে আসতে পারেনি । কিন্তু যখন তোমাকে দেখলাম তখন মনে হল নিয়তি অন্য কিছু করতে চায় । কিন্তু আমি তা চাই না। আমি চাই না আমার জীবনে তোমার আর প্রবেশ ঘটুক । আর একটা কথা । তোমার জন্য আমার মনে কি ছিল তা বলতে পারব না। কিন্তু এখন ঘৃনা জমে আছে। ”

 

বাজে স্বভাবের মত দুটি শব্দ আমার জীবনকে অন্য এক অধ্যায় দিয়ে দিল । কারন কথাটি চরিত্রের মত একটা দামি জিনিসকে অপমানিত করে ।

Nahid Ahmed

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here