অপ্রকাশিত অনুভুতি

নিয়াসা শাড়ির আচল দিয়ে কপালের ঘামটা মুছে দরজাটা খুলেই একটু অবাক হলো। এই সময়টাতে সাজ্জাদ বাসায় আসে না। নিয়াসার এমন তাকানো দেখে সাজ্জাদ একটু ওর দিকে তাকিয়ে দরজার ভিতরে ঢুকেই বললো..

“এতক্ষন লাগে দরজা খুলতে?

নিয়াসা কিছু না বলে সাজ্জাদের হাত থেকে অফিসের ব্যাগ টা নিয়ে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। সাজ্জাদ শিউলি ফুলের মালাটা টেবিলে রেখে সোফায় হেলান দিয়ে বসে। নিয়াসা ফেনটা ছেড়ে দিয়ে একটু কাছে গিয়ে বললো..

“আপনার কি শরীর খারাপ?
“না।
“অফিসে যান নি? বাসায় চলে এসেছেন এত তাড়াতাড়ি তাই জিজ্ঞেস করেছি।
“গিয়েছিলাম। ছুটি নিয়েছি। বাসায় একটু কাজ আছে।

 

নিয়াসা আর কিছু বললো না। যদিও কথাটা মিথ্যে সাজ্জাদের বাসায় কোন কাজ নেই। নিয়াসা একবার সাজ্জাদের দিকে তাকায় আর একবার টেবিলে রাখা শিউলি ফুলের মালার দিকে তাকায়। সাজ্জাদ পায়ের জুতোটা খুলতে খুলতে বললো..

“ঐ যে রাস্তার মোড়ে বাসের জন্য দাঁড়িয়েছিলাম কোথা থেকে যেন কয়েকটা ছেলে মেয়ে এসে এই ফুল গুলা ধরিয়ে দিল। আমি নিতে চাই নি। আমি নিয়ে কি করবো? ফুল দিয়ে তো আমার কোন কাজ নেই। আমাকে যখন বার বার বললো তখন না নিয়ে আর পারিনি।


নিয়াসা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শাড়ির আচলটা একটু ঠিক করে বললো..

“আচ্ছা আপনি ফ্রেশ হন। চুলায় রান্না বসিয়েছি। ফ্রেশ হয়ে নিন আমি চা দিচ্ছি।

এইটা বলেই নিয়াসা ভিতরে চলে যায়। নিয়াসা আর সাজ্জাদের বিয়ে হয়েছে বেশি দিন হয়নি। আজকের দিনসহ পনেরো দিন। সকালে আটটার দিকেই নাস্তা করে সাজ্জাদ অফিসে বের হয়ে যায়। অফিসে এসে ডেস্কে বসতেই আমজাদ সাহেব ওর কাছে এসে দাঁত খিলাল করতে করতে বললো..

“তো সাজ্জাদ মিয়া আইজকার দিনটা ছুটি নিতা।

আমজাদ সাহেবের পান খাওয়ার অভ্যাস আছে। এই অফিসের সবাই জানে আমজাদ সাহেব একটু রসিক মানুষ। যা বলে সরাসরি বলে বলে। সাজ্জাদ একটু অবাক হয় এই রকম কথা শুনে। কি বলবে বুঝতে পারে না। কেউ যদি দশ কথা বলে সাজ্জাদ দুই কথা বলে চুপ করে থাকে। বেশি কথা বলা ওর অভ্যাস নেই। নিজের অনুভূতি কারো মাঝে প্রকাশ করে না। কেমন একটা সাইলেন্ট টাইপের ছেলে। ওর চুপ থাকা দেখে আমজাদ সাহেব চেয়ারে বসে আবার দাঁত খিলাল করতে করতে বললো..

“তোমাদের বয়সে থাকতে আমরা কত কিছু করছি। এখনো মনের ভিতর থেকে প্রেম ভালোবাসা কমে নাই।
“জ্বী আপনাকে দেখলেই বুঝা যায়।

আমজাদ সাহেব কেন বলছে এইগুলা সাজ্জাদ কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পারে। এর একটু পরেই নীরা অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসতে বসতে বললো..

“আমজাদ ভাইয়া কি খবর আপনার?
“খবর তো মা শা আল্লাহ। সব কিছু আজকে হলুদ হলুদ লাগতেছে। তুমি একেবারে হলুদ হয়ে গেলা।
“হি হি হি। আজকের দিনটা স্পেশাল না, তাই একটু সাজলাম আর কি।
“তো স্পেশাল মানুষের কি খবর?
“ধুর আপনি নাহ? সাজ্জাদ ভাই দেখছেন উনি সব সময় আমার সাথে ফাইযলামি করে।

সাজ্জাদ কিছু না বলে একটু হাসে। নীরা এই অফিসেই কাজ করে। আমজাদ সাহেব সাজ্জাদের দিকে আবার তাকায় তারপর বললো..

“আমি তোমার থেকে পনেরো ষোল বছরের বড় হবো। কিন্তু আমার বেলায় এত দিবস ছিল না। আর থাকলেও তেমন পালন করতো না। এই কয়েক বছরে যা দিবস বের হইছে হাগ ডে, চকলেট ডে, প্রপোজ ডে, কিস ডে আরো কত কিছু। এইসব দিবস আমার বেলায় থাকলে কত কিছু করতাম, অবশ্য এখনো কম করি না, তোমার ভাবীরে যখন কিছু দিন আগে প্রপোজ ডে তে প্রপোজ করলাম তোমার ভাবীতো লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। হা হা হা।

যদিও কথাটা শুনে সাজ্জাদের হাসি পায়নি তারপরো ও একটু হাসলো আমজাদ সাহেবের সাথে তাল মিলিয়ে। নীরা একটু চুলটা ঠিক করে বললো..ঢং সব। আমজাদ সাহেব উঠে নিজের ডেস্কে গিয়ে বসে। সাজ্জাদ নীরার দিকে একটু ভালো করে তাকায়। তারপর একটু ইতস্তত করে বললো..

“হঠাৎ‍ আজকে শাড়ি?
“ওমা আজকে তো পহেলা ফাল্গুন জানেন নাহ?

সাজ্জাদ একটু চুপ করে থাকে। নীরা আবার বললো..

“আমি একটু আজকে ঘন্টাখানেক আগে বের হয়ে যাবো।
“কেন শরীর খারাপ?
“শরীর খারাপ হলে কি অফিসে আসতাম? আজকে বিকেলে ওর সাথে একটু বের হবো। ও পাঞ্জাবী আর আমি শাড়ি পড়েছি।
“ও আচ্ছা।

এইটুকু বলেই যে যার যার মত কাজ করতে থাকে। সাজ্জাদ একটু মোবাইল হাতে নিয়ে নিয়াসার বিয়ের ফটো গুলা একটার পর একটা দেখছে। তারপর কি যেন ভেবে আমজাদ সাহেবকে ডাক দিল..

“আমজাদ ভাই

আমজাদ সাহেব ডেস্ক থেকে উকি দিয়ে বলে..

“কি হয়েছে?
“হঠাৎ করে পেট ব্যথা করতেছে।
“কেন আবার কি হলো?
“জানি না। হঠাৎ করেই ব্যথা করতেছে।

নীরা একটু কাছে এসে বললো..

“পেট ব্যথা এটা ভালো না। আমারো একদিন হয়েছিল।

আমজাদ সাহেব কাছে আসতেই সাজ্জাদ বললো..

“পেট ব্যথা ভালো না। নীরার ও একদিন হয়েছিল ও বুঝতে পারে এটার ব্যথা কেমন। পেট ব্যথা করলে মানুষের বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। আমি আজকে চলে যাই?

আমজাদ সাহেব একটু চুপ করে রইলো। তারপর বললো..

“হ্যাঁ আসলেই ঠিক। পেট ব্যথা মানুষের বিশ্রামের প্রয়োজন হয়। তুমি বরং আজকে আস্তে ধীরে বাসায় যাও আমি সব কিছু ম্যানেজ করবো।

যদিও আমজাদ সাহেব বুঝতে পেরেছে। সাজ্জাদ আর কিছু না বলে অফিস থেকে বের হয়ে যায়। বের হয়েই রাস্তার মোড়ে এসে গাড়িতে উঠতে যাবে তখন ফুলের দোকানে চোখ গেল তারপর কি ফুল নিবে ভাবতেই শিউলি ফুলের মালা নিয়ে বাসায় আসে। যদিও সাজ্জাদ নিয়াসার কাছে সব কিছু প্রকাশ করেনি। সাজ্জাদ এই রকমি নিজের অনুভূতি কাউকে বুঝতে দেয় না। নিয়াসাকে বলেছিল বাসায় কাজ আছে তাই ছুটি নিয়েছে আর ফুল গুলা কয়েকটা বাচ্চা জোর করে ধরিয়ে দিয়েছে। ফ্রেশ হলেই নিয়াসা এক কাপ চা সাজ্জাদকে দিয়ে বলে..

“তা বাসায় হঠাৎ‍ কি কাজ? অফিসের থেকেও জরুরী?
“ইয়ে মানে আছে তুমি বুঝবা না। অনেক কাজ।
“আমাকে বলা যাবে? আমি না হয় হেল্প করলাম।

চায়ের কাপটা নিয়াসার হাত থেকে নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে বলে..

“চা টা ভালো হয়েছে। তুমি ভালো চা বানাতে পারো।

নিয়াসা চুপ করে রইলো। নিয়াসা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে সাজ্জাদ কথা ঘুরিয়ে ফেলেছে। বিয়ের পনেরোটা দিন হয়ে গেল এখনো কেউ কারো সাথে ফ্রি হতে পারে নি। সাজ্জাদ হতে চাইলেও পারেনি। নিয়াসা শাড়ির আচলটা দিয়ে হাতের আঙ্গুলে প্যাচিয়ে বললো..

“একটা কথা বলবো?
“হ্যা বলো।
“ফুল গুলা কি আমার জন্য এনেছেন?

সাজ্জাদ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চায়ের কাপটা নিয়াসাকে দিয়ে বলে..

“তুমি ভালো চা বানাও তো।

নিয়াসার একটু রাগ তৈরি হয়। দাঁতে দাঁত চেপে চায়ের কাপটা নেয়। আর ভাবে লোকটা এমন কেন? তারপর আবার বললো..

“জ্বি একটু আগেই বলেছেন আমি চা ভালো বানাই। কিন্তু ফুলগুলা?
“তোমার পছন্ধ হয়েছে? হলে তুমি নিয়ে নাও।
“না আমি জানতে চেয়েছিলাম ফুল গুলা কি আমার জন্যই এনেছেন?
“আমি তো বলেছি বাচ্চা গুলা জোর করে হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।

কথাটা শুনেই নিয়াসা মুখটা ভার করে ভিতরে চলে যায়। সাজ্জাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কি হতো সত্যটা বলে দিলে কি এমন হতো? এই পনেরো দিনে আমি যা বুঝেছি নিয়াসাকে, ও তেমন কিছুই আশা করে না, শুধু একটু ভালোবাসা ছাড়া। এইগুলা ভাবতে থাকে সাজ্জাদ। কিন্তু সাজ্জাদ এটা মনে করে ভালোবাসা কখনো প্রকাশ করতে নেই, ভালোবাসা প্রকাশ করলেই প্রিয় মানুষ গুলা থেকে কষ্ট পেতে হয় বেশি। সোফা থেকে উঠে টেবিল থেকে ফুল গুলা নিয়ে নিয়াসার কাছে যায় সাজ্জাদ। সাজ্জাদকে দেখে নিয়াসা একটু স্বাভাবিক হয়ে বললো..

“কিছু বলবেন?

সাজ্জাদ মাথা দিয়ে হ্যাঁ সূচক ইশারা দেয়।

“জ্বি বলুন।
“আসলে..
“বাসায় অনেক কাজ। আপনাকে সাহায্য করতে হবে?
“না। এই ফুল গুলা..
“হ্যাঁ এই ফুল গুলা কি?
“এই ফুল গুলা আমি তোমার জন্যই কিনে এনেছি। অফিস থেকে পেট ব্যথার নাম করে ছুটি নিয়ে বাসায় চলে এসেছি। আমার বাসায় কোন কাজ নেই। আজ পহেলা ফাল্গুন তো তাই। কখনো এই দিনে কারো সাথে তেমন যাই নি, হাত ধরে হাটে নি, রিকশায় ঘুরি নি, বই মেলায় যাইনি, পাঞ্জাবী পড়িনি, ফুচকা, আইসক্রীম, ঝালমুড়ি খাইনি, ইচ্ছে হয়েছিল তাই বাসায় চলে এসেছি। তুমি না চাইলে এসবের কিছুই প্রয়োজন নেই।

নিয়াসা কি বলবে বুঝতে পারে না। ও অন্য দিকে ঘুরে তাকায়। চোখের কোনে পানি জমতে শুরু করেছে। শাড়ির আচলটা দিয়ে চোখটা একটু মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো..

“আপনি আমার সামনে থেকে যান। আপনি জানেন আপনি কি পরিমান খারাপ একটা লোক।

সাজ্জাদের মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়। একটু ইতস্তত করে বললো..

“আসলে আমি বলতে চাইনি। কিন্তু..

সাজ্জাদ পুরো কথাটা শেষ না করে একটু চুপ হয়ে চলে যেতেই নিয়াসা সাজ্জাদের হাতটা ধরে বলে..

“আপনাকে আমি শুধু শুধু খারাপ বলি নি। আমার ফুল আমাকে না দিয়ে যাচ্ছেন কোথায়? ফুল দিয়ে যান বলছি।

সাজ্জাদ কি বলবে বুঝতে পারে না। মাথাটা চুলকিয়ে একটু হেসে নিয়াসাকে ফুল গুলা দিয়ে ব্যাস্ত শহরে অপ্রকাশিত অনুভূতির স্বপ্ন দেখার আশা দেখে। আর এই অপ্রকাশিত অনুভূতির স্বপ্নগুলোই আমাদের চারপাশে ঘুরতে থাকে। কেউ প্রকাশ করে আর কেউ করে না…

লেখা: Jahedul Hoque Subon

এক্ষন কলা গাছে লাগিক দেন

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here