অচেনা তুমি

0
12

“নীল তুমি আর আমাকে ভালোবাসো না..!” অয়নীর মুখে এমন ধারার কথা শুনে চমকে উঠল নীল। অবাক চোখে তাকিয়ে আছে অয়নীর দিকে। কী বলবে বুঝতে পারছে না। অয়নী কি মজা করে বলল কথাটা নাকি সিরিয়াসলি বলল তা এখনো নীলের বোধগম্য হচ্ছে না।
নীল ধীর কণ্ঠে বলল,

– তোমার তাই মনে হচ্ছে বুঝি!

-তা নয়তো কী?

-এরকম মনে হবার কারণটা কী শুনি?

-তুমি আর আগের মতো আমার মেসেজের উত্তর দাও না। আর আমার কল ধরো না। কখনোবা ধরলেও বেশিক্ষণ কথা বলো না। কাজের দোহাই দিয়ে ফোন রেখে দাও। দেখা করতে চাইলে বলো বিজি আছো। দেখা করা সম্ভব না।
তোমার ইগনোরগুলো আমাকে কতটা আহত করে তা কি তুমি জানো না নীল?

নীল এবার কী উত্তর দিবে বুঝতে পারছে না। সে কি অয়নীর কাছে ক্ষমা চাইবে! কিন্তু নীল তো কোনো দোষ করেনি তাহলে ক্ষমা চাইবে কেন!

নীল কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,

-এতেই তুমি বুঝে ফেললে তোমাকে আমি আর ভালোবাসি না! তোমায় আমি ইগনোর করছি!

-তা নয়তো কী? সারাদিন ব্যস্ত থাকো মেনে নিলাম। দেশের সব কাজ তোমাকে একা করতে হয় তাই তুমি রাতেও ব্যস্ত থাকো সেটাও নাহয় মেনে নিলাম। কিন্তু তাই বলে কি একটিবার মেসেজ চেক করা যায় না! একটি বার কি তোমার মনে হয়না কেউ তোমাকে মনে করে কতো শত মেসেজ করে সেটা দেখি…

নীল একদম নিশ্চুপ। দূর মাঠে ছোটো ছোটো পিচ্চিরা ফুটবল খেলছে। সেখান থেকে চিৎকার ভেসে আসছে তাদের। বোধহয় অনেক্ষণ পর কেউ গোল দিতে পেরেছে তাই তাদের খুশির ঢেউ বাঁধ ভেঙেছে।

অয়নী আবার বলতে লাগল,

-আমার বান্ধবীর বয়ফ্রেন্ডরা কত্তো ভালো জানো তুমি সেটা?

নীল বিষম খেল। তারপর অনেকটা অবাক আর কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছে।

অয়নী বলল,

-ওর বয়ফ্রেন্ডরা রোজ ওদের গার্লফ্রেন্ড মানে আমার বান্ধবীর সাথে দেখা করার জন্য আমাদের লেডিস হোস্টেলের সামনে এসে অপেক্ষা করে ঘন্টার পর ঘন্টা।

নীলের ভিতর জমা হওয়া ভয়ের মেঘ কেটে গিয়েছে। এখন মিটমিট করে হাসছে ও।

অয়নী মুখ ফুলিয়ে আবার বলতে লাগল,

– ওদের বয়ফ্রেন্ড ওদের সাথে দেখা করে কতো হেসে হেসে কথা বলে। মাঝে মাঝে আমার কিছু বান্ধবী দাম বাড়ানোর জন্য ওদের সাথে দেখা করে না৷ বলে পরে দেখা করবে এখন ফোন না দিতে..

নীল কথার মাঝে থামিয়ে দিয়ে বলল,

– কেন? তোমার বান্ধবীরা বুঝি বাজারের পন্য যে দাম বাড়ানোর জন্য আরেকজনকে রাস্তার ওপর দাঁড় করিয়ে রাখে..!

অয়নী প্রতিবাদের স্বরে বলল,

-তা হতে যাবে কেন? তোমার মুখে খালি বাজে কথা। জানো তখন ওরা জানালা দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে ওদের বয়ফ্রেন্ডদের অসহায় মুখ দেখে আর হাসাহাসি করে…

– তোমার বান্ধবীরা আসলে টাইম পাস করে।

অয়নী নীলের দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকা করে বলল,

-অন্তত তোমার মতো ওরা কেয়ারলেস না..

-যাক বাবা আমি আবার কী করলাম!

– আগামীকাল ভ্যালেনটাইনস্ ডে উপলক্ষে ওরা কতো আয়োজন করেছে। কত লিস্ট করেছে। কত জায়গায় বেড়াতে যাবে বলেছে। লেট নাইট পার্টি সহ আরও কতো কী!

নীল অয়নীর দিকে তাকিয়ে বলল,

-লেট নাইট পার্টি তুমি পছন্দ করো?

-কখনোই না। আমি তো শুধু ওদের আগামীকালকের লিস্টের কথা বলছিলাম।

-ওহ্…

বেলা নেমে এসেছে। নদীর পাড়ে অনেক্ষণ বসে থাকার দরুন একটু শীত শীত লাগছে অয়নীর।

অয়নী একটু আদুরে গলায় বলল,

-আচ্ছা তুমি তো সারাবছরই ব্যস্ত থাকো। আগামীকালকে কি একটু ছুটি নেওয়া যায় না? একটু একান্তে সময় কাটাতে পারি না আমরা? কোনোরকম পিছুটান ছাড়াই একটু নিজেদের ভাবের আদান প্রদান কি করতে পারি না আমরা?

-গতকালকের জন্যই তো লাস্ট এক মাস আমি প্রচুর কাজ করেছি আমি। প্রচুর ছোটাছুটি করতে হয়েছে আমাকে। আর এজন্য ই তো তোমাকে কোনো সময় দিতে পারিনি। তবে আগামীকাল সারাদিন তোমার সাথেই থাকব। এবং তোমাকেও থাকতে হবে আমার সাথে।

অয়নী অবাক হয়ে বলল,

– কী কাজ যে আমাকে দরকার হবে স্যারের। এতদিন তো কোনো খোঁজ ছিল না। হঠাৎ আগামীকাল দরকার হবে কেন শুনি!

অয়নী ক্ষণকাল পর দুষ্টুমিভরা কণ্ঠে বলল,

-স্যারের কোনো মতলব আছে নাকি ১৪ ফেব্রুয়ারি নিয়ে?

নীল অয়নীর কাছে এসে কানের কাছে বলল,

-আছে বৈকি। তোমাকে ছাড়া সম্ভব ই তো না..!

-ম্ম…মানে…

অয়নী নীলের দিকে চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে আছে। ক্রমাগত কান গরম হয়ে আসছে ওর। নীল কী বলবে বুঝতে পারছে না ও।

নীল বলল,

-কেন তুমি রাজি না? নাকি আমাকে বিশ্বাস করতে পারছ না? কোনটা?

অয়নীর মনে হচ্ছে বুকের ভিতরে হাতুড়ি পিটচ্ছে কেউ একজন।

গলা শুকিয়ে আসছে ওর। কী বলবে নীল আর কী জবাব দেবে ও এখন!

নীল আবারও বলল,

-ভয় নাইরে বাবা। তোমার ক্ষতি হয় বা সমস্যাতে পড়ো এরকম কাজ করব না। ইউ ক্যান ট্রাস্ট মি।

এবারই তো প্রথম। প্রথমবার তো একটু আকটু ভুল হতেই পারে, তাই না? তবে সামলে নিতে হবে আমাদের। কাজেই নো চিন্তা, ওকে?

অয়নীর মনে হচ্ছে ওর ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে। সৃষ্টি কর্তা ওকে এ কোন বিপদে ফেলল তা এখনো বুঝতে পারছে না।

অয়নীর মনে হচ্ছিল ও অনেকটা ঘেমে গেছে। মুখ চোখ থেকে গরম বের হচ্ছে।

কাঁপা কাঁপা গলায় অয়নী বলল,

-কিসের কথা বলছ তুমি নীল?

-সেটা আগামীকাল গেলেই বুঝতে পারবে।

-কোথায় যাওয়ার কথা বলছ তুমি?

– দুই তিন জায়গায়। তবে প্রথমে যাবো বাড্ডাতে তারপর টঙ্গী…

অয়নী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নীল হঠাৎ এরকম জায়গায় যেতে চাইছে কেন! তা বুঝতে পারছে না।

তারপর জিজ্ঞেস করল,
-কেন?

-বললাম না গত একমাস প্রচুর পরিশ্রম করেছি শুধু আগামীকালকের জন্য।

-মানে…

-আরে পাগলী আগামীকাল আমরা যাবো বাড্ডা টঙ্গীসহ আরও বেশ কিছু জায়গায় যেখানে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা টাকার অভাবে মানুষের অন্যতম মৌলিক অধিকার বস্ত্র তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই আমি আর আমার কিছু ফ্রেন্ড নিজেদের জমানো টাকা আর লাস্ট মাসে বিভিন্ন বড়ো বড়ো কোম্পানীর কাছে রিকুয়েষ্ট করে করে টাকা গুছিয়েছি। আজ সকাল থেকে তো পিচ্চিদের জন্য আন্দাজ মতো বিভিন্ন সাইজের জামা কাপড় কেনা হয়েছে অনেক অনেক চকলেটও কেনা হয়েছে।

আমরা দুপুর পর্যন্ত বলতে বিকালের আগেই বড়ো বড়ো দুটো জায়গাতে বস্ত্র বিতরণ করব তারপর বিকালে বিভিন্ন এতিম খানাতে বাচ্চাদের কাপড় দিবো। চকলেট দিবো। ওদের সাথে আমরা সময় কাটাবো।

হ্যাঁ বছরে একটা দিন যদি ওদের কষ্ট একটু ভুলিয়ে রাখা যায় তাহলে মন্দ কী! হোকা না এতে আমার মতো মানুষের মাসের পর মাস পরিশ্রম তোমার মতো মানুষের স্যাক্রিফাইজ! এতে যদি কারও মুখে ক্ষণকালের জন্য হাসি ফোটাতে পারি তবে যে শান্তি পাওয়া যাবে তা কি অন্য কোথাও আদৌ পাওয়া সম্ভব!

অয়নী বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। কী বলবে বুঝতে পারছে না৷ মনের অজান্তে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।

কিছু বলতে গিয়ে অনুভব করল ওর গলা ধরে আসছে। চুপ করে গেল ও।

এখন অযথা কথা বলে অনুভূতিটাকে নষ্ট করার মানে হয় না কোনো।

নীলের কাঁধে মাথা রেখে অয়নী নদীর বয়ে চলা জলের দিকে তাকিয়ে থাকল। মনের অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসল ওর ভিতর থেকে। ১৪ ফেব্রুয়ারি আসলেই অনেকের কাছে স্পেশাল। শুধু ধরণটা ভিন্ন…!

ধন্যবাদ সবাইকে।

©নিলয় রসুল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here